আগের সরকার যে পথে হেঁটেছে, বর্তমান সরকারও সেই পথেই হাঁটছে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘সরকারকে বিদায় দেওয়ার জন্য আমাদের এই আন্দোলন নয়। কিন্তু কেউ যদি বিদায় নেওয়ার আমল করে, আমরা কী করতে পারি? বর্তমান সরকার সেই পথেই হাঁটছে।’ শনিবার রাতে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফা ইশতেহারে বলা হয়েছিল, সমাজের সব স্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই দেশ পরিচালনা করবেন। কিন্তু এখন বিভিন্ন জায়গায় প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে দলীয় লোকদের বসানো হচ্ছে। চট্টগ্রামের মেয়রকে এর ‘জ্বলন্ত প্রমাণ’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মেয়রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তিনি পদে বহাল রয়েছেন বলে তাঁরা জানতে পারছেন।
জামায়াতের আমির প্রশ্ন করেন, ‘এটা কি গণতন্ত্র, নাকি ফ্যাসিবাদ?’ গণভোটের প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে সব রাজনৈতিক দলই জনগণকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সেই রায় বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের ছয় মাস পার হয়ে গেলেও বিএনপি সেই প্রতিশ্রুতি রেখেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, অতীতে অনেক সরকার ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু কোনো সরকারের দুই বা ছয় মাসের মধ্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকার টিকবে না—এমন আলোচনা দেখা যায়নি। তাঁর দাবি, বর্তমানে দেশের মানুষের মুখে মুখে একই কথা—এই সরকার টিকবে না। অলি আহমদ বলেন, ‘এই দেশে একমাত্র ১১ দলীয় জোটই সুশাসন দিতে পারে।’ তিনি বিএনপির অতীত সরকারের সমালোচনা করে দুর্নীতি ও খেলাপি ঋণের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। ১১ দলীয় জোটকে ক্ষমতার বাইরে রাখার পেছনে ‘ষড়যন্ত্র’ হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন অলি আহমদ। তাঁর দাবি, ভারত, সরকারি কর্মকর্তা, মুহাম্মদ ইউনূস ও বিএনপি মিলে এই ষড়যন্ত্র করেছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে তিনি বিস্তারিত কোনো তথ্য তুলে ধরেননি।
অলি আহমদ আরও বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ছয় মাসে এক লাখ মানুষের চাকরি দেওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু তাঁর দাবি, উল্টো গত ছয় মাসে এক লাখ মানুষ বেকার হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘চাটুকাররাই প্রধানমন্ত্রীকে ডোবাবে, ১১ দলীয় জোট কিছু করবে না।’
সমাবেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের রায় উপেক্ষা করার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। একইভাবে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করা না হলে জনগণ আবার রাজপথে নামবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি। মামুনুল হক বলেন, গণভোট কোনো ‘ছেলে ভোলানো খেলা’ ছিল না; এটি ছিল রাজনৈতিক অঙ্গীকার। বিএনপি ও ১১ দল জনগণের কাছে এই অঙ্গীকার করেছিল বলে দাবি করেন তিনি। গণভোটের বিষয়ে বিএনপির অবস্থানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দল ‘আত্মস্বীকৃত মুনাফেকের দলে’ পরিণত হয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বৈরাচারী সরকারের রেখে যাওয়া সমস্যার কারণে দেশে অরাজকতা তৈরি হচ্ছে বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা যথেষ্ট নয়। এসব সমস্যার সমাধান করতে না পারলে সরকারের উচিত জনগণের কাছে তা স্বীকার করা। নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার একা দেশের সব সমস্যা সমাধান করতে পারছে না—এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। তাঁর ভাষায়, ‘বিরোধীদল সমর্থন না দিলে একা এই দেশ চালানো আপনার পক্ষে সম্ভব নয়। এই বাস্তবতা মেনে নিন।’
প্রধানমন্ত্রীর সংসদে কম কথা বলার সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী সংসদে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি এ ক্ষেত্রে সালাউদ্দিন আহমদকে দায়িত্ব দিয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর বাবার অতীতের ভুল পুনরাবৃত্তি না করার আহ্বান জানান। নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করে সরকার গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে প্রতারণা করছে।
এর আগে শনিবার সকালে ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার পদুয়া বাজার, চৌদ্দগ্রাম ও ফেনীতে পথসভা শেষে রাতে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও অপরাধ দমন, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে দলীয়করণ বন্ধ করা।