পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের জন্য প্রতিবেশী দেশের চেয়ে দেশের অন্য প্রদেশগুলো থেকেই এখন বড় নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ শরিফ। তিনি বলেছেন, পাঞ্জাব, সিন্ধু ও বেলুচিস্তানের সীমান্তবর্তী ত্রি-সীমান্ত এলাকা এবং অন্যান্য প্রদেশের সঙ্গে লাগোয়া অঞ্চলগুলো থেকেই মূলত এসব নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় সীমান্তবর্তী যৌথ তল্লাশিচৌকিগুলো আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। শনিবার লাহোরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি নিয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন মরিয়ম নওয়াজ। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিও টিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
মরিয়ম নওয়াজ বলেন, পাঞ্জাবে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ মোকাবিলায় সম্ভাব্য সব উপায় ও সম্পদ কাজে লাগানো হচ্ছে।
পাঞ্জানের সঙ্গে পাকিস্তানের চারটি প্রদেশের মধ্যে তিনটি—সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়া—সীমান্ত রয়েছে। মরিয়ম নওয়াজের বক্তব্যের অর্থ হলো, ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশের চেয়ে বর্তমানে পাকিস্তানের অন্য প্রদেশগুলো থেকে আসা সন্ত্রাসী, সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সংঘবদ্ধ অপরাধীরাই পাঞ্জানের দৈনন্দিন আইনশৃঙ্খলার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। পাঞ্জাবের দক্ষিণে সিন্ধু প্রদেশ। দুই প্রদেশের সীমান্তবর্তী সিন্ধু নদের চর ও জঙ্গলঘেরা দুর্গম অঞ্চল ‘কাচ্চা’ নামে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলটি ভারী অস্ত্রে সজ্জিত বিভিন্ন অপরাধী ও ডাকাত দলের আস্তানা হিসেবে পরিচিত।
রকেট লঞ্চার ও অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গানসহ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত এসব অপরাধী চক্র নিয়মিত অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও চোরাচালানের মতো অপরাধে জড়িত। পাঞ্জাব ও সিন্ধু—দুই প্রদেশের আইনশৃঙ্খলার জন্যই তারা বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করেছে।
পাঞ্জাবের উত্তর-পশ্চিমে খাইবার পাখতুনখোয়া। আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী এই প্রদেশে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)সহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। প্রদেশটির সীমান্তবর্তী অঞ্চল ব্যবহার করে জঙ্গিরা পাঞ্জাবের সীমান্তবর্তী জেলা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্থাপনায় হামলা চালিয়ে থাকে।
পাঞ্জাবের পশ্চিমে বেলুচিস্তান। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা চলছে। বালুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) ও বালুচ লিবারেশন ফ্রন্টের (বিএলএফ) মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতাও রয়েছে। এই সীমান্ত চোরাচালানের রুট হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
এ ছাড়া সংঘবদ্ধ অপরাধীরা এক প্রদেশে অপরাধ করে অন্য প্রদেশে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। প্রদেশগুলোর পুলিশের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অনেক ক্ষেত্রে তাদের গ্রেপ্তার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
পাঞ্জাবে মরিয়ম নওয়াজের দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) ক্ষমতায় রয়েছে। অন্যদিকে খাইবার পাখতুনখোয়ায় ক্ষমতাসীন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। দুই প্রদেশের রাজনৈতিক বিরোধও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগকে জটিল করে তোলে।
তবে পাঞ্জাবের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেছেন মরিয়ম নওয়াজ।
তিনি বলেন, অতীতে অনেক তল্লাশিচৌকিতে জঙ্গিদের কাছে পুলিশের চেয়ে উন্নত অস্ত্র ও নাইট-ভিশন সরঞ্জাম ছিল। ফলে এসব চৌকিতে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্য নিহত হয়েছেন। এখন তল্লাশিচৌকিগুলোতে বুলেটপ্রুফ সুরক্ষা, থার্মাল ইমেজিং ও নাইট-ভিশন ক্যামেরা যুক্ত করা হয়েছে। এতে হতাহতের ঝুঁকি অনেকটাই কমেছে।
পাঞ্জাবে শান্তি বজায় রাখতে ‘বেশ কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত’ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, যেখানেই রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, সেখানেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
দশকের পর দশক ধরে অপরাধীদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কাচ্চা অঞ্চলগুলো পুরোপুরি পরিষ্কার করে অপরাধমুক্ত এলাকায় পরিণত করার দাবি করেন মরিয়ম নওয়াজ। তাঁর দাবি, পাঞ্জাবে অপরাধের মাত্রা প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে।
উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি আইনের শাসন নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, রাস্তাঘাট ও বড় বড় প্রকল্প তৈরি হলেও যদি মানুষের গবাদিপশু, মোটরসাইকেল বা গাড়ি চুরি হয়, কিংবা কোনো দরিদ্র মানুষ তার সঞ্চয়ের শেষ সম্বলটুকু হারান, তাহলে সেই উন্নয়নের মূল্য কী?
দুর্নীতির বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সুথরা পাঞ্জাব’ কর্মসূচির আওতায় দুর্নীতির অভিযোগ শনাক্ত হওয়ার পর কয়েকজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
দুর্নীতির তথ্য জানাতে নাগরিকদের জন্য হেল্পলাইন চালুর পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ সদস্যদের কর্মকাণ্ড নজরদারিতে বডি ক্যামেরা ব্যবহারের কথাও জানান তিনি।
মরিয়ম নওয়াজ বলেন, ১০০ রুপির দুর্নীতির ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেখানে দুর্নীতি হবে, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
ধর্মকে ব্যবহার করে বিদ্বেষ ছড়ানোর চেষ্টার বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থানের কথা জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে পুলিশকে অন্য দায়িত্ব থেকে মনোযোগ সরিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। তবে মহররম, ঈদে মিলাদুন্নবীসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব এবার শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধও বরদাশত করা হবে না বলে জানান তিনি।
অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান প্রসঙ্গে মরিয়ম নওয়াজ বলেন, হকারদের উচ্ছেদ করা হলেও তাঁদের জীবিকা নির্বাহের জন্য বিকল্প জায়গার ব্যবস্থা করা হয়েছে। হেলমেট ব্যবহার এবং নির্ধারিত লেনে গাড়ি চালানোর নিয়ম কার্যকর করার ক্ষেত্রেও শুরুতে সমস্যা হলেও এখন পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।