ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন দেশটি দীর্ঘ সামরিক সংঘাত, আন্তর্জাতিক চাপ ও গভীর অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর এটিই দেশটির প্রথম সাধারণ নির্বাচন। ওই হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, লেবাননে সংঘাত এবং ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও রাজনীতিকে নতুন করে নাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায়, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা এবং সরকারের প্রতি জনআস্থার প্রশ্নও নির্বাচনের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
২৭ অক্টোবরের ভোট তাই শুধু নতুন পার্লামেন্ট নির্বাচনের ঘটনা নয়; এটি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রতি ভোটারদের মূল্যায়নেরও একটি পরীক্ষা। তবে নির্বাচনের ফলই সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্ধারণ করে না। ইসরায়েলের সংসদীয় ব্যবস্থায় ১২০ আসনের নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন নিশ্চিত করে সরকার গঠন করতে হয়। ভোটের পর চূড়ান্ত আসন বণ্টন ও জোটের দর-কষাকষিই নির্ধারণ করবে, দেশটির পরবর্তী সরকার কে নেতৃত্ব দেবেন। ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভোট গণনা ও যাচাই চলমান; চূড়ান্ত ফল ঘোষণার আগে সরকার গঠনের সমীকরণ নিশ্চিত নয়।
নেতানিয়াহুর সামনে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা
ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু গত ১৭ বছরের মধ্যে ১৫ বছরেরও বেশি সময় এবং মোট প্রায় ১৯ বছর দেশটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থে কঠোর অবস্থানের নেতা। অন্যদিকে, সমালোচকদের অভিযোগ, তাঁর নেতৃত্বে দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ বেড়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা নেতানিয়াহুর নিরাপত্তানীতিকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলে। হামলার আগে ইসরায়েলের গোয়েন্দা ও সামরিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা কীভাবে ঘটল, সরকার কেন হামলা ঠেকাতে পারল না এবং পরবর্তী সময়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়েছে কি না—এসব প্রশ্ন নির্বাচনি বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিরোধীরা এ ব্যর্থতার দায় নির্ধারণে তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি তুলেছে। নতুন সরকার গঠিত হলে সম্ভাব্য তদন্ত কমিশনের ভূমিকা ও কার্যক্রম নিয়েও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ তাঁর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলার সঙ্গেও সম্পর্কিত। ২০১৯ সাল থেকে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগে বিচার চলছে। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। নির্বাচনে তাঁর জোট দুর্বল হলে রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে; তবে ভোটের ফলের সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়ার ফলাফলকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। মামলার পরিণতি নির্ধারিত হবে আদালতের কার্যক্রমের মাধ্যমে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ২০২৪ সালে গাজা যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কথিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। নেতানিয়াহু ও ইসরায়েল এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। নির্বাচনের ফল তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে, কিন্তু পরোয়ানা বা বিচারপ্রক্রিয়া নির্বাচনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে না।
জোটের অঙ্কে আটকে যেতে পারে সরকার গঠন
ইসরায়েলের নির্বাচনি ব্যবস্থায় ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে নয়, রাজনৈতিক দলের তালিকাকে ভোট দেন। নেসেটের ১২০টি আসন আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে বণ্টিত হয়। কোনো দল জাতীয় ভোটের অন্তত ৩.২৫ শতাংশ না পেলে সংসদে আসন পায় না। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন।
নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোটে রয়েছে কট্টর ডানপন্থি ও অতি-রক্ষণশীল ধর্মীয় দল। এর মধ্যে শাস, ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম, ইতামার বেন-গভিরের ওতজমা ইয়েহুদিত এবং বেজালেল স্মোত্রিখের রিলিজিয়াস জায়োনিজম রয়েছে। এসব দলের সমর্থন নেতানিয়াহুর জোটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দাবিগুলো সরকার পরিচালনায় জটিলতা তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরও একক দলের নেতৃত্বে নয়। সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের ইয়াশার, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও বিরোধীদলীয় নেতা ইয়াইর লাপিদের সঙ্গে যুক্ত টুগেদার জোট, ইয়াইর গোলানের ডেমোক্র্যাটস এবং আভিগদোর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেইনু—এমন একাধিক রাজনৈতিক শক্তি নেতানিয়াহুর বিকল্প সরকার গঠনের চেষ্টা করছে। তাদের মধ্যে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর বিষয়ে ঐকমত্য থাকলেও নিরাপত্তা, ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক এবং ফিলিস্তিননীতি নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
ভোটের আগে প্রকাশিত জনমত জরিপে কোনো শিবিরই ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি। সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কানের একটি জরিপে বিরোধী শিবিরের জন্য ৫২টি এবং নেতানিয়াহুর জোটের জন্য ৫০টি আসনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। এগুলো ছিল ভোটের আগের জরিপ, চূড়ান্ত ফল নয়। নির্বাচনের পরও আসন বণ্টন ও জোটের সমীকরণ পুরোপুরি স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত কে সরকার গঠন করবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না।
দুই প্রধান শিবিরই আপাতত আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে তাদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কোনো জোট প্রয়োজনীয় আসন না পেলে সংখ্যালঘু সরকার, সংসদের বাইরে থাকা দলের সমর্থন নিয়ে সরকার পরিচালনা কিংবা দীর্ঘ দর-কষাকষির পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। শেষ পর্যন্ত সরকার গঠন ব্যর্থ হলে নতুন নির্বাচনও অসম্ভব নয়।
ভোটারদের সামনে যুদ্ধ, নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রের প্রশ্ন
নির্বাচনের অন্যতম বড় ইস্যু হলো নিরাপত্তা। ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েলি সমাজে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। একদিকে বহু ভোটার হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান চান; অন্যদিকে দীর্ঘ যুদ্ধের মানবিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। গাজা, লেবানন এবং ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাত কোন পথে এগোবে, তা নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে।
তবে নির্বাচনে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের নৈতিকতা ও ফিলিস্তিনিদের ওপর তার প্রভাব নিয়ে বিতর্ক থাকলেও দেশটির নির্বাচনি প্রচারে প্রাধান্য পেয়েছে নিরাপত্তা, নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব এবং অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থার প্রশ্ন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, ৭ অক্টোবরের হামলা এবং তার পরবর্তী যুদ্ধের প্রসঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রচারে নেতানিয়াহুর ভূমিকা, নিরাপত্তা ব্যর্থতা, সামরিক সেবা ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
আরেকটি বড় বিতর্ক অতি-রক্ষণশীল ইহুদি সম্প্রদায়ের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি। ইসরায়েলে সামরিক সেবা জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু অতি-রক্ষণশীল সম্প্রদায়ের অনেক সদস্য দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় শিক্ষার কারণে সামরিক সেবা থেকে ছাড় পেয়ে আসছেন। যুদ্ধের সময়ে সেনাসদস্যদের ওপর বাড়তি চাপ এবং সাধারণ নাগরিকদের দায়িত্ব ভাগাভাগির প্রশ্নে এ ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ বেড়েছে। নেতানিয়াহুর জোটের ধর্মীয় দলগুলো এ বিষয়ে ছাড় বজায় রাখতে চাইলে বিরোধীদের সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়তে পারে।
বিচারব্যবস্থা সংস্কারের প্রশ্নও নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নেতানিয়াহু সরকারের সংস্কার উদ্যোগকে সমর্থকেরা বিচারব্যবস্থার ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্বিন্যাসের প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরেছেন। সমালোচকদের মতে, এসব উদ্যোগ আদালতের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করতে পারে। বিরোধী শিবিরের ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থি অংশ মনে করে, নতুন সরকার গঠনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনআস্থা পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে নতুন সরকার এলেই রাজনৈতিক মেরুকরণ কমবে বা বিচারব্যবস্থার বিতর্ক মিটে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে ভোট
গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের কারণে দেশটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর চাপ বেড়েছে। বিভিন্ন দেশ ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে; কিছু মিত্র পশ্চিম তীরের বসতি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় বহু দেশের প্রতিনিধি কক্ষ ত্যাগ করেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এসব ঘটনা ইসরায়েলের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে চলমান বিরোধের প্রতিফলন।
নতুন সরকার বর্তমান নীতি অব্যাহত রাখবে, নাকি ইউরোপীয় দেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করবে—তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে বিরোধী সরকার এলেও ফিলিস্তিননীতি, নিরাপত্তা ও বসতি প্রশ্নে তাৎক্ষণিক বড় পরিবর্তন ঘটবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ইসরায়েলের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, অধিকৃত অঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সামরিক অভিযান নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোট কতটা গুরুত্বপূর্ণ
ইসরায়েলের নির্বাচনে দেশটির ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোট সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নির্বাচনের আগে প্রায় ৭৩ লাখ নাগরিক ভোট দেওয়ার যোগ্য ছিলেন; তাঁদের মধ্যে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকের সংখ্যা আনুমানিক ১২ লাখ। আর গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে বসবাসকারী লাখ লাখ ফিলিস্তিনি এই নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি, যদিও ইসরায়েলি সরকারের সিদ্ধান্ত তাঁদের