ইউটিজের সাত আসন সরে গেলে নেতানিয়াহুর শিবিরের শক্তি কমে ৪৬-এ
ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে ভোট গণনা শেষ হলেও সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের মিত্র কট্টরপন্থি ইহুদি দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম (ইউটিজে) বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বে সংখ্যালঘু সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। দলটি এমন সিদ্ধান্ত নিলে নেতানিয়াহুর সরকার গঠনের হিসাব আরও জটিল হয়ে উঠবে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২-এর বরাতে বৃহস্পতিবার এ খবর প্রকাশিত হয়। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউটিজে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন সরকারে সরাসরি যোগ দেবে না। বরং পার্লামেন্টের বিভিন্ন ভোটাভুটিতে বিরত থেকে বা সরকারের বিরুদ্ধে ভোট না দিয়ে সরকারকে টিকে থাকতে সহায়তা করতে পারে। তবে এ বিষয়ে দলটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন। নির্বাচনের ভোট গণনা শেষে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন শিবির পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে, আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরের আসন ৪৮। আরব নেতৃত্বাধীন দুই দল—জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম—মিলিয়ে পেয়েছে ১৯টি আসন। ফলে কোনো শিবিরই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।
ইউটিজের আসনসংখ্যা সাত। দলটি নেতানিয়াহুর শিবির থেকে সরে গেলে ওই শিবিরের আসন কমে দাঁড়াবে ৪৬টিতে। বিপরীতে, বিরোধী শিবিরের পক্ষে ইউটিজের সমর্থন বা অন্তত ভোটাভুটিতে বিরোধিতা না করার সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে ইউটিজের সাত সদস্যের অবস্থানই সরকার গঠনের চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করবে—এমন নয়; অন্য দলগুলোর সমর্থন এবং পার্লামেন্টে ভোটের সমীকরণও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ইউটিজের নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষোভের প্রধান কারণ ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইয়েশিভার শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আইন। দলটি দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের অব্যাহতির নিশ্চয়তা চেয়ে আসছে। কিন্তু এ বিষয়ে অগ্রগতি না হওয়ায় নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউটিজের এক সূত্র চ্যানেল ১২-কে বলেছেন, ‘আমরা নেতানিয়াহুর কাছ থেকে কিছুই পাব না। তাঁর সঙ্গে আমাদের জোটের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, বিশেষ করে এখন যখন তাঁর কাছে ৬১টি আসন নেই। আমাদের উদ্দেশ্য হলো, আবারও নেসেটে একটি শক্তিশালী ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো দল হওয়া।’
ইউটিজের অবস্থান বদলের পেছনে দীর্ঘদিনের অসন্তোষও রয়েছে। দলটি ২০২৫ সালের জুলাইয়ে নেতানিয়াহুর তৎকালীন সরকার থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল। সামরিক বাহিনীতে অতিধর্মীয় ইহুদি তরুণদের নিয়োগ ও ইয়েশিভার শিক্ষার্থীদের অব্যাহতির প্রশ্নে বিরোধ তখন থেকেই প্রকট হয়ে ওঠে। এবারের নির্বাচনের পর সরকার গঠনের নতুন সমীকরণে দলটি নিজেদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে, আইজেনকোটের জন্যও সরকার গঠনের পথ সহজ নয়। তাঁর নেতৃত্বাধীন শিবিরের ৪৮টি আসন সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে ১৩টি কম। তাই সরকার গঠন করতে হলে তাঁকে অন্য দলের সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আরব দলগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে রা’আম পার্টির আটটি আসন সরকার গঠনের আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে আরব দলগুলোর সমর্থন পাওয়া এবং সেই সমর্থনের শর্তে একমত হওয়া—দুটিই রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়।
ইসরায়েলের নির্বাচনী ফল অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি একক দল হিসেবে সর্বাধিক ২৭টি আসন পেয়েছে। আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি পেয়েছে ২১টি। কিন্তু বৃহত্তম দল হওয়া সত্ত্বেও লিকুদ ও তার মিত্ররা প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে সরকার গঠনের প্রশ্নে এখন শুধু নির্বাচনে কে বেশি আসন পেয়েছে, তা নয়; বরং কে অন্য দলগুলোর সমর্থন আদায় করতে পারবে, সেটিই প্রধান বিবেচ্য হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করার পর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেবেন। নতুন নেসেটের অধিবেশন বসার কথা ১০ নভেম্বর। এর আগে জোট গঠনের আলোচনা চলবে। কোনো পক্ষই প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারলে দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে; এমনকি নতুন নির্বাচনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।