পচেফস্ট্রুমের মাঠে একসময় বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে মেতেছিলেন তাওহিদ হৃদয়। পাঁচ বছর পর একই মাঠে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নতুন ইতিহাস লিখলেন তিনি। দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের বিপক্ষে দ্বিতীয় আনঅফিসিয়াল টেস্টে ৪৮১ বলে অপরাজিত ৩৫০ রান করে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ প্রথম শ্রেণির ইনিংসের রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন বাংলাদেশ ‘এ’ দলের অধিনায়ক।
হৃদয়ের ৩৫০ রানের ইনিংসে ছিল ২৭টি চার ও ১০টি ছক্কা। তাঁর রেকর্ডময় ইনিংসের ওপর ভর করে দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের বিপক্ষে ৮ উইকেটে ৬৭৬ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ ‘এ’। জবাবে দ্বিতীয় ইনিংসে দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ ১২ ওভারে কোনো উইকেট না হারিয়ে ১৮ রান তোলার পর ম্যাচটি ড্র মেনে নেয় দুই দল।
তবে ম্যাচ ড্র হলেও বাংলাদেশের ক্রিকেটে দিনটি হয়ে থাকল হৃদয়ের নামে। দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এতদিন কোনো বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান সাড়ে তিনশ রানের মাইলফলক ছুঁতে পারেননি। এতদিন সর্বোচ্চ ইনিংসের রেকর্ডটি ছিল তামিম ইকবালের—৩৩৪ রান। তামিমকে ১৬ রান পেছনে ফেলে বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ৩৫০ রান করলেন হৃদয়।
শুধু দেশের মাটিতে নয়, দেশের বাইরেও নতুন রেকর্ড গড়েছেন তিনি। এর আগে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ প্রথম শ্রেণির ইনিংস ছিল ২১৮ রান। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে করাচিতে ডিফেন্স হাউজিং অথোরিটির বিপক্ষে ২১৮ রান করেছিলেন সাবেক ওপেনার শাহরিয়ার হোসেন। হৃদয় সেটিকেও ছাড়িয়ে যান ম্যাচের শেষ দিনে।
রেকর্ডের দিনটি শুরু হয়েছিল ২০৪ রান নিয়ে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে হৃদয়ের আগের সর্বোচ্চ ইনিংস ছিল ২১৭ রান। দিনের শুরুতেই সেটি ছাড়িয়ে যান তিনি। এরপর ২১৮ রান করে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ডটি নিজের করে নেন।
বাংলাদেশ ‘এ’ দলের অষ্টম উইকেট পড়ার সময় হৃদয়ের রান ছিল ২২৫। তখন মনে হচ্ছিল, বড় ইনিংসের পথে তাঁর যাত্রা থেমে যেতে পারে। কিন্তু রেজাউর রহমান রাজা এসে তাঁকে দারুণভাবে সঙ্গ দেন। দুজনের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে যোগ হয় ১৫৭ রান। রেজাউর ১১০ বলে ৩১ রানে অপরাজিত থাকেন। তাঁর ইনিংসে ছিল চারটি চার ও দুটি ছক্কা।
রেজাউরকে পাশে পেয়ে হৃদয় একের পর এক মাইলফলক পেরিয়ে যান। ৩৮১ বলে ২৫০ রান পূর্ণ করেন তিনি। লাঞ্চের বিরতিতে যান ২৭৪ রান নিয়ে। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দল নতুন বল হাতে নেয়। তাতেও হৃদয়কে থামানো যায়নি।
৪৫০ বল খেলে ট্রিপল সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তিনি। বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তৃতীয় ট্রিপল সেঞ্চুরিয়ান হিসেবে নাম লেখান হৃদয়। এর আগে এই কীর্তি ছিল কেবল রকিবুল হাসান ও তামিম ইকবালের। রকিবুলের সর্বোচ্চ ইনিংস ছিল ৩১৩, তামিমের ৩৩৪।
তিনশ রান পূর্ণ করার পরও থামেননি হৃদয়। চা-বিরতিতে তাঁর রান ছিল ৩৩৩। তখন দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের অধিনায়ক মার্কের আকারম্যান তাঁর কাছে গিয়ে জানতে চান, বাংলাদেশ ইনিংস ঘোষণা করবে কি না। হৃদয় তখনও ব্যাটিং চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছার কথা জানান।
বিরতির পর অবশ্য বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি। মাত্র ৩১ বলেই ৩৩৩ থেকে ৩৫০ রানে পৌঁছে যান তিনি। টেপো এনটুলির বল মিড উইকেটে ঠেলে সিঙ্গল নিয়ে সাড়ে তিনশ পূর্ণ করার পর কোনো উচ্ছ্বাস দেখাননি হৃদয়। বরং আম্পায়ারের দিকে থামস-আপ দেখিয়ে বুঝিয়ে দেন, তাঁর ব্যাটিংয়ের এখানেই ইতি।
এরপর বাংলাদেশ ‘এ’ দল ১৯১.২ ওভারে ৮ উইকেটে ৬৭৬ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে। হৃদয় ৪৮১ বলে ৩৫০ রানে অপরাজিত ছিলেন। ৩৫০ রানের এই ইনিংস তাঁকে শুধু বাংলাদেশের রেকর্ডের শীর্ষে বসায়নি, দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতেও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ইনিংসের মালিক করেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় কোনো বিদেশি ব্যাটসম্যানের ট্রিপল সেঞ্চুরির নজির এতদিন ছিল ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি ডেনিস কম্পটনের। ১৯৪৮ সালে এমসিসির হয়ে ৩০০ রানের ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। হৃদয় এবার সেই তালিকায় নিজের নাম যুক্ত করার পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকার অনেক ব্যাটসম্যানকেও ছাড়িয়ে গেছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে হৃদয়ের ৩৫০ এখন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস। তাঁর ওপরে আছেন কেবল স্টিভেন কুক। সাবেক দক্ষিণ আফ্রিকান ওপেনার ২০০৯ সালে লায়ন্সের হয়ে ৬৪৮ বলে ৩৯০ রান করেছিলেন।
হৃদয়ের এই কীর্তির আগে অবশ্য ম্যাচের পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য স্বস্তিদায়ক ছিল না। প্রথম আনঅফিসিয়াল টেস্টে প্রিটোরিয়ায় দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের কাছে ইনিংস ও ৪১৩ রানে হেরেছিল বাংলাদেশ ‘এ’। সেই ম্যাচের পর দ্বিতীয় টেস্টে এসে ব্যাট হাতে এমন দাপুটে প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের জন্য বড় পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দিয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের প্রথম ইনিংসের ৫১২ রানের জবাবে বাংলাদেশ ‘এ’ ৬৭৬ রান করে ১৬৪ রানের লিড নেয়। বাংলাদেশের ইনিংসে হৃদয়ের পাশাপাশি রেজাউরের অপরাজিত ৩১ রানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দক্ষিণ আফ্রিকার বাঁহাতি স্পিনার কাইল সিমন্ডস ৪ উইকেট নিলেও ৫৯ ওভারে দিয়েছেন ২৯৩ রান। অফ স্পিনার টেপো এনটুলি ৫৪.২ ওভারে ২১৪ রান দিয়ে নেন ১ উইকেট।
শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দ্বিতীয় ইনিংসে ১২ ওভারে ১৮ রান তুললে ম্যাচ ড্র হয়। দুই ম্যাচের সিরিজ অবশ্য ১-০ ব্যবধানে জিতে নেয় দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’।
ম্যাচসেরার পুরস্কারও অনুমিতভাবেই পেয়েছেন হৃদয়। আর সিরিজসেরা হয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার সিনেথেম্বা কেশিলে। প্রথম আনঅফিসিয়াল টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করার পর দ্বিতীয় টেস্টেও সেঞ্চুরি করেছেন তিনি।
দুই দলের লড়াই এবার গড়াচ্ছে ওয়ানডে সিরিজে। রোববার ব্লুমফন্টেইনে শুরু হবে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ। সেই সিরিজেও বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবেন তাওহিদ হৃদয়। ফলে ৩৫০ রানের ঐতিহাসিক ইনিংসের পর সীমিত ওভারের ক্রিকেটেও তাঁর নেতৃত্ব ও ব্যাটিংয়ের দিকে থাকবে আলাদা নজর।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দল ইনিংস: ৫১২ ও ১২ ওভারে ১৮/০
বাংলাদেশ ‘এ’ দল ১ম ইনিংস: ১৯১.২ ওভারে ৬৭৬/৮ (ডি.) (আগের দিন ৪৭১/৬) (হৃদয় ৩৫০*, নাঈম ১৬, মুরাদ ১১, রেজাউর ৩১*; মোরেকি ২৫-৬-৬৩-২, বোস্ট ২৫-২-৯২-১, সিমন্ডস ৫৯-৩-২৯৩-৪, পটগিটার ২০-৮-৪৬-০, এনটুলি ৫৪.২-৭-২১৪-১, আকারম্যান ৮-১-২১-০)।
ফল: ম্যাচ ড্র।
সিরিজ: ২ ম্যাচের সিরিজে দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দল ১-০ ব্যবধানে জয়ী।
ম্যান অব দা ম্যাচ: তাওহিদ হৃদয়। ম্যান অব দা সিরিজ: সিনেথেম্বা কেশিলে।