প্রত্যাশাটা ছিল অনেক। গত এপ্রিলে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর বাংলাদেশের যুবদলকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল নতুন আশাবাদ। দীর্ঘ ২৪ বছরের অপেক্ষা শেষে অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপের মূল পর্বে ওঠার স্বপ্নও দেখছিল দলটি। কিন্তু উজবেকিস্তানে এসে সেই স্বপ্ন এখন কঠিন সমীকরণের সামনে।
প্রথম ম্যাচে স্বাগতিক উজবেকিস্তানের কাছে ২-০ গোলে হারের পর এবার সিরিয়ার কাছেও হারল বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার তাসখন্দের দস্তলিক স্টেডিয়ামে ‘বি’ গ্রুপের ম্যাচে বাংলাদেশের জালে তিনবার বল পাঠিয়েছে সিরিয়া। বাংলাদেশ পারেনি একবারও। ফলে ৩-০ গোলের হারে বাছাইপর্বে টানা দ্বিতীয় পরাজয় নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে জেরার্ড জোন্সের দলকে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন গোলের অভাব। দুই ম্যাচে পাঁচ গোল হজম করেছে দল, অথচ প্রতিপক্ষের জালে একবারও বল পাঠাতে পারেনি। শেষ ম্যাচে ভারতকে হারাতে না পারলে বাছাইপর্ব থেকেই বিদায় নিশ্চিত হবে। ভারতকে হারালেও মূল পর্বে যাওয়ার জন্য তাকিয়ে থাকতে হবে অন্য ম্যাচগুলোর ফল ও নানা সমীকরণের দিকে।
এবারের বাছাইপর্বে আট গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন দল সরাসরি মূল পর্বে উঠবে। তাদের সঙ্গে সেরা সাত রানার্সআপও পাবে সুযোগ। আগামী বছর চীনে অনুষ্ঠেয় মূল পর্বে আয়োজক হিসেবে চীন সরাসরি খেলবে। অর্থাৎ বাছাইপর্ব থেকে মোট ১৫টি দল জায়গা পাবে মূল প্রতিযোগিতায়।
‘বি’ গ্রুপের পরিস্থিতিও বাংলাদেশের জন্য এখন বেশ কঠিন। দুই ম্যাচ শেষে উজবেকিস্তান, ভারত ও সিরিয়ার পয়েন্ট ৩ করে। বাংলাদেশ এখনো পয়েন্টশূন্য। রোববার গ্রুপে নিজেদের শেষ ম্যাচে ভারতের মুখোমুখি হবে তারা।
সেই ম্যাচে জিততেই হবে বাংলাদেশকে। এরপর অপেক্ষা করতে হবে গ্রুপের অন্য ফলাফলের জন্য। রানার্সআপদের মধ্যে সেরা সাত দলের তালিকায় জায়গা করে নেওয়ার জন্য গোল ব্যবধানসহ একাধিক হিসাব সামনে আসবে। দুই ম্যাচে পাঁচ গোল হজম করে কোনো গোল না দেওয়ায় এই জায়গাতেও বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে।
সিরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে বাংলাদেশের প্রতিরোধ ভাঙে প্রথমার্ধের শেষ দিকে। ৪৪ মিনিটে সতীর্থের লম্বা পাস ধরে অ্যালান মামো বল নিয়ে এগিয়ে গিয়ে সিরিয়াকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। বাংলাদেশ তখনও ম্যাচে ফেরার সুযোগ খুঁজছিল। কিন্তু প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে ডি-বক্সের বাইরে থেকে শটে মারিওস আলহেরেক ব্যবধান দ্বিগুণ করেন।
দুই মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল—সেখানেই মূলত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারায় বাংলাদেশ।
দ্বিতীয়ার্ধে সিরিয়ার আক্রমণ ঠেকাতে গোলরক্ষক রাজ চৌধুরীকে বেশ কয়েকবার পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়েছে। প্রথম ম্যাচের মতোই এ ম্যাচেও একাধিক ভালো সেভ করেছেন তিনি। কিন্তু সতীর্থরা তাঁকে সেই সেভগুলোর সুফল এনে দিতে পারেননি। বাংলাদেশের আক্রমণ ছিল নিষ্প্রভ; সিরিয়ার গোলমুখে বল নিয়ে গেলেও কার্যকর কোনো আক্রমণ তৈরি করতে পারেনি তারা।
ম্যাচের আগে একাদশেও বড় পরিবর্তন এনেছিলেন কোচ জেরার্ড জোন্স। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে খেলা একাদশ থেকে সাতটি পরিবর্তন করা হয়। আলোচনায় থাকা প্রবাসী ফুটবলার অ্যাডাম আব্বাসকেও শুরু থেকে মাঠে নামানো হয়। কিন্তু তাতেও দলের আক্রমণভাগে প্রাণ ফেরেনি। লক্ষ্যে কোনো শটই নিতে পারেনি বাংলাদেশ।
শেষ পর্যন্ত ৮৯ মিনিটে তৃতীয় গোলটি হজম করে বাংলাদেশ। আবদুল্লাহ আল নাজারের নিচু শট রাজ চৌধুরীর পক্ষে আটকানো সম্ভব হয়নি। ৩-০ গোলের পরাজয় তখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।
অথচ এই দলটিকে ঘিরে প্রত্যাশা ছিল অন্য রকম। গত এপ্রিলে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে বাংলাদেশ যুবদল আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছিল। অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপের মূল পর্বে সর্বশেষ খেলার পর কেটে গেছে ২৪ বছর। ২০০২ সালের পর আর মূল পর্বে জায়গা করে নিতে পারেনি বাংলাদেশ। সেই খরা কাটানোর লক্ষ্যেই এবার দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়েছিল দলটি।
ইংলিশ কোচ জেরার্ড জোন্সের অধীনে যশোরে প্রায় দুই মাসের ক্যাম্প করা হয়। দলকে শক্তিশালী করতে প্রবাসে বেড়ে ওঠা পাঁচ তরুণ ফুটবলারকেও দলে নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে এবারের দল নিয়ে আশাবাদ ছিল যথেষ্ট।
কিন্তু মাঠে নামার আগেই অস্বস্তি শুরু হয়। সফরের আগে খবর আসে প্রধান কোচ জেরার্ড জোন্স ও সহকারী কোচ আতিকুর রহমান মিশুর মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। দেশ ছাড়ার আগে সংবাদ সম্মেলনেও কোচ কিংবা অধিনায়ক—কেউ উপস্থিত ছিলেন না। তখন থেকেই দলের ভেতরের অস্থিরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
মাঠের খেলায়ও সেই অস্থিরতার ছাপ স্পষ্ট। প্রথম ম্যাচে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশ প্রতিরোধ গড়লেও আক্রমণে ছিল দুর্বল। সিরিয়ার বিপক্ষে একাদশে সাত পরিবর্তন করেও সেই চিত্র বদলানো যায়নি।
বাংলাদেশের সামনে এখন শেষ সুযোগ ভারত ম্যাচ। কিন্তু সেই ম্যাচ জিতলেই যে এশিয়ান কাপের মূল পর্ব নিশ্চিত হবে, তা নয়। বরং নিজেদের জয়, গ্রুপের অন্য ম্যাচের ফল এবং রানার্সআপদের সামগ্রিক হিসাব—সবকিছুর দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।
সাফের আঞ্চলিক সাফল্যের পর এশিয়ার বড় মঞ্চে ওঠার যে স্বপ্ন নিয়ে উজবেকিস্তানে গিয়েছিল বাংলাদেশ, সিরিয়ার কাছে এই হারে সেই স্বপ্ন এখন অনেকটাই ফিকে। রোববার ভারতের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে তাই শুধু জয় নয়, নিজেদের গোলখরাও ভাঙার পরীক্ষা দিতে হবে বাংলাদেশের যুবাদের।