নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের জন্য নির্ধারিত একটি পরিদর্শন কক্ষের নামফলকে কার নাম থাকবে—এ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম ও বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বিলকিস ইসলামের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে উপজেলা পরিষদ চত্বরে কক্ষটির উদ্বোধন ঘিরে এ ঘটনা ঘটে।
বিতণ্ডার একপর্যায়ে জামায়াতের সংসদ সদস্যের উদ্দেশে বিলকিস ইসলাম বলেন, **“এটা সংসদেও উঠাব এবং এমপিগিরি দেখাব। আমি আমার অধিকার আদায় করে নেব।”** ঘটনাটি নিয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারহা ফাতেহা তাকলিমা বলেন, সংসদ সদস্যদের জন্য পরিদর্শন কক্ষটি প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি মূলত তাঁদের এখতিয়ারের বিষয়।
স্থানীয় নেতা-কর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সৈয়দপুর উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের বসার জন্য একটি কক্ষ প্রস্তুত করা হয়। মঙ্গলবার বিকেলে সেটির উদ্বোধনের আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানে নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম উপস্থিত ছিলেন।
পরে খবর পেয়ে বিএনপির সংরক্ষিত আসন-৭-এর সংসদ সদস্য বিলকিস ইসলাম উপজেলা পরিষদে যান। সেখানে গিয়ে উদ্বোধনের জন্য তৈরি করা নামফলকে শুধু আব্দুল মুনতাকিমের নাম দেখতে পান তিনি। কক্ষটি যেহেতু সংসদ সদস্যদের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত, তাহলে সেখানে শুধু একজন সংসদ সদস্যের নাম কেন—এ প্রশ্ন তোলেন বিলকিস।
এরপরই দুই সংসদ সদস্যের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, নামফলক নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ তাঁদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি চলে। পরে উপস্থিত রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়।
বিলকিস ইসলামের দাবি, উপজেলা পরিষদের ওই পরিদর্শন কক্ষ শুধু আব্দুল মুনতাকিমের ব্যবহারের জন্য নয়। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের জন্য এ ধরনের কক্ষ রাখা হয় এবং অন্য কোনো মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য এলেও সেটি ব্যবহার করতে পারেন।
বিলকিস বলেন, **“পরিদর্শন কক্ষটি শুধু আব্দুল মুনতাকিমের নামে হতে পারে না। এটি সংসদ সদস্যদের ব্যবহারের জন্য। যেই সংসদ সদস্য আসবে পর্যায়ক্রমে তারাই এই কক্ষ ব্যবহার করবে।”**
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জেলার কিশোরগঞ্জ ও জলঢাকা উপজেলায় থাকা পরিদর্শন কক্ষের নামফলকে কোনো সংসদ সদস্যের নাম নেই। তাহলে সৈয়দপুরে শুধু একজনের নাম কেন থাকবে, সেটিই তাঁর প্রশ্ন।
বিলকিস আরও বলেন, উদ্বোধনের আগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আব্দুল মুনতাকিমকে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলা হলেও তিনি তা করেননি। তাঁর দাবি, সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁকে জেলার একাধিক আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিলকিসের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি যখন নামফলকে শুধু আব্দুল মুনতাকিমের নাম থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন তাঁকে বলা হয়, জাতীয় সংসদের ৩৫০ জন সদস্যই এ ধরনের কক্ষ ব্যবহার করতে পারবেন। তবে উপজেলা পরিষদটি যেহেতু আব্দুল মুনতাকিমের নির্বাচনী এলাকার মধ্যে, তাই নামফলকে তাঁর নাম রাখা হয়েছে।
এর জবাবে বিলকিস তাঁকে বলেন, সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের একাধিক আসনের দায়িত্ব পালন করতে হয়। এরপরই তিনি সংসদে বিষয়টি তোলার কথা বলেন।
তবে আব্দুল মুনতাকিমের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি বলেন, পরিদর্শন কক্ষটি সব সংসদ সদস্যের জন্যই। কিন্তু সৈয়দপুর উপজেলা তাঁর নির্বাচনী এলাকার মধ্যে হওয়ায় নামফলকে তাঁর নাম রাখা হয়েছে।
মোবাইল ফোনে তিনি বলেন, **“সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক নির্বাচনি এলাকা নেই। তাই তাঁদের জন্য পরিদর্শন কক্ষও নির্দিষ্ট নয়। ফলে পরিদর্শন কক্ষ নিয়ে অধিকার দাবি করতে হলে সংশ্লিষ্ট পরিপত্র বা নীতিমালা অনুযায়ী করতে হবে।”**
অনুষ্ঠানে দলবল নিয়ে এসে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার অভিযোগও করেন আব্দুল মুনতাকিম। তাঁর মতে, বিষয়টি শান্তিপূর্ণভাবে আলোচনা করেই সমাধান করা যেত।
এ বিষয়ে বিএনপির সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা শাখার সভাপতি অধ্যক্ষ আব্দুল গফুর সরকার বলেন, পরিদর্শন কক্ষের নামফলকে দুই সংসদ সদস্যের নাম থাকার কথা ছিল। সেখানে শুধু জামায়াতের সংসদ সদস্যের নাম রাখা হয়েছে। তাঁর মতে, এটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ভুলও হতে পারে।
আব্দুল গফুর সরকারের ব্যাখ্যা, বিরোধের মূল জায়গাটি হলো—জামায়াতের সংসদ সদস্য বলছেন, সৈয়দপুর তাঁর ভৌগোলিক নির্বাচনী এলাকা। অন্যদিকে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বলছেন, দলীয় দায়িত্বের কারণে তিনি সৈয়দপুর ও কিশোরগঞ্জসহ একাধিক আসন দেখভাল করেন।
উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাজহারুল ইসলামও ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর ভাষ্য, শান্তিপূর্ণভাবে বসে আলোচনা করলেই বিষয়টির সমাধান সম্ভব ছিল। কিন্তু সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য নেতা-কর্মীদের নিয়ে অনুষ্ঠানে আসায় পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইউএনও ফারহা ফাতেহা তাকলিমা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাব্বির হোসেন, সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যক্ষ আব্দুল গফুর সরকার, সাধারণ সম্পাদক শাহীন আক্তার শাহিন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সামসুল আলম ও এম এ পারভেজ লিটন এবং সৈয়দপুর উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাজহারুল ইসলামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন।
ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত কেবল একটি নামফলক নিয়ে বিরোধে সীমাবদ্ধ থাকেনি; সংসদ সদস্যদের জন্য উপজেলা পরিষদে বরাদ্দ করা সরকারি পরিদর্শন কক্ষ ব্যবহারের অধিকার ও সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের দায়িত্বের পরিধি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। বিষয়টি সংসদে তোলার কথা জানিয়েছেন বিলকিস ইসলাম। অন্যদিকে আব্দুল মুনতাকিম বলছেন, এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা বা পরিপত্রই হবে সিদ্ধান্তের ভিত্তি। ফলে একটি কক্ষের নামফলক নিয়ে শুরু হওয়া বিরোধ সামনে প্রশাসনিক ও সংসদীয় পর্যায়েও গড়ায় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।