বুকে হাত দিয়ে দৌড়ে এসে বলেছিলেন ‘আমারে বাঁচান’; ১০০ গজ দূরে পড়ে মৃত্যু, মামলায় তিনজনের নাম
ফজরের নামাজের পরও সড়ক তখন প্রায় ফাঁকা। হঠাৎ বুকে হাত দিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় এক যুবককে দৌড়ে আসতে দেখেন কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী। দৌড়াতে দৌড়াতে তিনি বলছিলেন, ‘আমারে বাঁচান, বাঁচান।’ প্রায় ১০০ গজ যাওয়ার পর বিদ্যুতের খুঁটিতে ধাক্কা খেয়ে সড়কে পড়ে যান তিনি। এরপর সেখানেই নিথর হয়ে পড়েন ২৬ বছর বয়সী নাঈম ওরফে রাব্বী। শুক্রবার ভোরে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকার স্বপ্ন সুপার শপের সামনে ঘটে এ ঘটনা। সেখানে দায়িত্বে থাকা তিন নিরাপত্তাকর্মী রাব্বীকে আহত অবস্থায় দৌড়ে আসতে দেখেছেন। তবে ভয় ও আতঙ্কে কেউ তাঁর কাছে এগিয়ে যাননি। পরে ফজরের নামাজ শেষে কয়েকজন মুসল্লি তাঁকে পড়ে থাকতে দেখে পুলিশে খবর দেন। পুলিশ এসে রাব্বীর মরদেহ উদ্ধার করে।
রাব্বী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাঁর বোন আছমা বেগম রোববার যাত্রাবাড়ী থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় মো. রাজু (২৮), আজম খান পাপ্পু (২৭) ও ফারুক (২৮)-এর নাম উল্লেখ করে আরও ৭ থেকে ৮ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। সেদিন বিকেলে মামলার এজাহার আদালতে পৌঁছালে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ্ ফারজানা হক তা গ্রহণ করেন। আগামী ৮ অক্টোবরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে যাত্রাবাড়ী থানাকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মহিন উদ্দিন।
মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয়েছে যাত্রাবাড়ী থানার এসআই মোহাম্মদ আমীর হোসেনকে। তিনি বলেন, ‘রাব্বী নামে এক যুবক হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। শুনেছি, আমাকে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সবেমাত্র তদন্তভার পেয়েছি। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হবে। আসামি গ্রেপ্তার হলে খুনের কারণ জানা যাবে।’
ঘটনার তিন দিন আগে স্বপ্ন সুপার শপের নিরাপত্তার দায়িত্বে যোগ দিয়েছিলেন শুক্কুর গাজী। শুক্রবার ভোরে তিনিও দায়িত্বে ছিলেন। শুক্কুর বলেন, ‘আমরা ডিউটিতে ছিলাম। দেখি একটা ছেলে দৌড়াতে দৌড়াতে আসছে। বুক হাত দিয়ে চেপে ধরা। আমরা ভাবছি, অনেকে শয়তানি করে, সেও হয়তো শয়তানি করছে। বলে, আমারে বাঁচান, আমারে বাঁচান, বাঁচান। পরে বিদ্যুতের খাম্বার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায়। বুক থেকে তখন হাত সরে যায়। পরে দেখি রক্ত।’
রাব্বীকে আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেও কাছে না যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে শুক্কুর বলেন, ‘ভয়ে আমরা ধরিনি। ধরলে আবার কী না কী হয়।’ তাঁর ভাষ্য, স্বপ্ন সুপার শপের সামনে ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটেনি। পরে তিনি জানতে পারেন, প্রায় ১০০ গজ দূরে রাব্বীকে বুকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছিল। শুক্কুর বলেন, ‘সে বাঁচার জন্য হয়তো দৌড় দিয়েছিল। তার আশপাশে বা সঙ্গে কাউকে দেখিনি।’
বৃহস্পতিবার রাতে নিরাপত্তার দায়িত্বে যোগ দেওয়া আরেক কর্মী জাহিদুল ইসলামও রাব্বীকে আহত অবস্থায় দৌড়ে আসতে দেখেছেন। তিনি বলেন, ‘কয়েক দিন আগে স্বপ্ন সুপার শপের এসির লাইন চুরি হয়। ম্যানেজার স্যার আমাদের বলেছেন, ডিউটির সময় চারপাশ ঘুরে দেখতে। আমরা দোকানের পেছন থেকে সামনে আসি। দেখি একজন বুকে হাত দিয়ে দৌড়ে আসছে। বলছে, আমাকে বাঁচান, আমাকে বাঁচান, বাঁচান। পরে সে পড়ে যায়। দেখি বুক থেকে রক্ত ঝরছে।’ জাহিদুল বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, কোনো না কোনো বিপদে পড়ি। এজন্য আর কাছে যাইনি। কয়েকজন মুসল্লি নামাজ পড়ে ফেরার পথে তাকে দেখতে পায়। পুলিশে ফোন দেয়। পরে পুলিশ আসে। কেউ কিন্তু ভয়ে তাকে ধরেনি। যা করার পরে পুলিশ এসে করেছে।’
পাশের আরেক ভবনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা রমিজ উদ্দিনও ভোরে রাব্বীকে দৌড়াতে দেখেছিলেন। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে স্বপ্ন সুপার শপের পাশের ভবনের চারতলায় ধোয়ামোছার কাজ করছিলেন। রাত ৩টার দিকে কাজ শেষ করে নিজের জায়গায় বসে ছিলেন। ফজরের আজান হলে নামাজে যান। নামাজ শেষ করে ফিরে গেট খোলার সময় একটি ছেলেকে দৌড়ে যেতে দেখেন। রমিজ বলেন, ‘এরকম অনেকে দৌড়ে যায়। এজন্য আর তেমন গুরুত্ব দিইনি। একটু ঘুমিয়ে পড়ি। সাড়ে ৬টার দিকে উঠি। পরে জানতে পারি, একটা ছেলে খুন হয়েছে।’
মামলার এজাহারে আছমা বেগম অভিযোগ করেছেন, তাঁর ভাই রাব্বী স্ত্রী ও শিশুসন্তানকে নিয়ে যাত্রাবাড়ীর শনিরআখড়া এলাকার গোবিন্দপুরে থাকতেন। বাবার সঙ্গে যাত্রাবাড়ীর মাছের আড়তে ব্যবসার কাজ করতেন তিনি।
এজাহারে বলা হয়েছে, রাব্বীর সঙ্গে আসামিদের বিরোধ চলছিল। শুক্রবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে আড়তে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হন রাব্বী। সকাল ৫টার দিকে কাজলার ছনটেক বাঁশপট্টি ১ নম্বর গলিতে পৌঁছালে রাজু, পাপ্পু ও ফারুকসহ অজ্ঞাতনামা আসামিরা তাঁকে থামান। একপর্যায়ে তাঁকে মারধর করা হয় এবং রাজু তাঁর বুকে ছুরিকাঘাত করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। ছুরিকাঘাতে রাব্বী মাটিতে পড়ে যান। তাঁর ডাক-চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে আসামিরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে রাব্বীর মৃত্যু হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। বাদী আছমা বেগম বলেন, ‘আমার ভাইকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে। মামলা করেছি। আশা করছি, পুলিশ দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার করবে।’
আসামিদের সঙ্গে রাব্বীর পূর্বপরিচয় ছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসামিরা পূর্বপরিচিত ছিল কি না জানি না। পুলিশ এখন সেটা বের করবে। আমার জানা মতে, ওই এলাকায় তাঁর পরিচিত কেউ নেই। ছোট থেকে শনিরআখড়া এলাকায় বড় হয়েছে।’ আছমার ভাষ্য, আড়তে কাজে যাওয়ার জন্যই সেদিন ভোরে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন রাব্বী। তাহলে তিনি কাজলা এলাকায় কীভাবে গেলেন—এ প্রশ্নে তাঁর ধারণা, ছনটেক বাঁশপট্টি এলাকা থেকে আসামিরা তাঁকে ধরে নিয়ে যেতে পারে, অথবা ফোন করে সেখানে ডেকে নিতে পারে। তবে এ বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই।
দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে রাব্বী ছিলেন সবার ছোট। প্রায় দেড় বছর আগে তাঁর বিয়ে হয়। স্ত্রী সোনিয়ার সঙ্গে তাঁর একটি পুত্রসন্তান রয়েছে বলে জানান আছমা।
রাব্বী মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন—এমন গুঞ্জনও নাকচ করেছেন তাঁর বোন। আছমার দাবি, যারা এ ধরনের কথা ছড়াচ্ছে, তারা সত্য গোপন করতে চাইছে। তাঁর ধারণা, রাব্বী হয়তো কোনো গোপন বিষয় দেখে ফেলেছিলেন এবং সে কারণেই তাঁকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে তাঁর এ বক্তব্যের পক্ষে কোনো প্রমাণের কথা তিনি জানাননি।
রাব্বীর মৃত্যুর পর তাঁর হাতে কাটা দাগ দেখা গিয়েছিল বলে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। এ বিষয়ে আছমা বলেন, প্রায় সাত-আট বছর আগে একটি মেয়ের সঙ্গে রাব্বীর সম্পর্কের বিষয়টি পরিবার জানতে পারে। পরে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হলেও মেয়েটির মা তাঁকে পড়াশোনা শেষ করার কথা বলেন। তখন বিষয়টি মেনে নিতে না পেরে রাব্বী নিজের হাতে আঘাত করেছিলেন বলে দাবি করেন আছমা। তাঁর ভাষ্য, ওই পুরোনো দাগকে এখন ভিন্নভাবে প্রচার করা হচ্ছে।
মামলার প্রধান আসামি রাজুর মা মোসাম্মৎ নাজনীন অবশ্য রাব্বীর সঙ্গে ফারুকের একটি পুরোনো বিরোধের কথা বলেছেন। তাঁর দাবি, মাসখানেক আগে শনিরআখড়া এলাকায় রাব্বী ও রাসেল নামে একজন ফারুককে আটক করে মারধর করেছিলেন। পরে ফারুকের স্ত্রীর কাছে ফোন করে টাকা চাওয়া হয় এবং টাকা দেওয়ার পর ফারুককে ছেড়ে দেওয়া হয়। নাজনীনের ভাষ্য, শুক্রবার ভোরে রাব্বী ছুরিকাহত হওয়ার পর ফারুক তাঁকে ফোন করেন। ফারুক তাঁকে ‘মা’ বলে ডেকে রাব্বীকে হাসপাতালে নেওয়ার অনুরোধ করেন। নাজনীন বলেন, ‘ফারুক আমাকে মা বলে ডাকে। বলে, মা ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাও। আমি বাসা থেকে বের হই। রাজুর বাবা আমাকে বলে, দাঁড়াও, আমি দেখে আসি। উনি এসে দেখেন ছেলেটা প্রায় যায় যায়। পরে ফিরে গিয়ে বলেন, গিয়ে আর কিছু করার নাই। পরে তো মারাই গেল।’
রাজুর তিন বছরের একটি সন্তান রয়েছে জানিয়ে নাজনীন বলেন, ‘ও তো মরছেই, আরও কয়েকজনকে মাইর্যা গেছে। রাজুর বাচ্চাটা সারাদিন বাবা বাবা করে।’ তবে রাব্বীকে হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ কী এবং রাজু ও ফারুকের সঙ্গে তাঁর বিরোধের সূত্রপাত কোথায়—সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি নাজনীন।
রাব্বী হত্যাকাণ্ডে এখনো কাউকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়নি। হত্যার কারণও নিশ্চিত হয়নি। পুলিশের ভাষ্য, তদন্তের মাধ্যমে রাব্বীর সঙ্গে আসামিদের বিরোধের প্রকৃতি, ঘটনার আগে তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ হয়েছিল কি না এবং কোথায় ও কীভাবে ছুরিকাঘাত করা হয়—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে আপাতত যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাতে ছুরিকাহত হওয়ার পরও রাব্বী কিছুটা পথ দৌড়ে বাঁচার চেষ্টা করেছিলেন। স্বপ্ন সুপার শপের সামনে এসে তিনি সাহায্যের জন্য আকুতি জানান। কিন্তু নিরাপত্তাকর্মীরা ভয় পেয়ে তাঁর কাছে যাননি। পরে মুসল্লিদের খবর পেয়ে পুলিশ এসে তাঁকে উদ্ধার করে।
এখন পরিবারের অপেক্ষা আসামিদের গ্রেপ্তার ও হত্যার কারণ জানার। আর তদন্ত কর্মকর্তার সামনে মূল প্রশ্ন—ভোরের ওই কয়েক মিনিটে ঠিক কী ঘটেছিল, কারা রাব্বীকে ছুরিকাঘাত করেছিল এবং কী কারণে তাঁকে হত্যা করা হলো। এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই বেরিয়ে আসবে।