ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি ছাড়া ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন এবং শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য আলাদা ওয়েবসাইট চালুর ঘটনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এসব কর্মকাণ্ডকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন, বিধি ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভাষ্য, ডাকসু গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান হলেও তার সব কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হতে হবে। প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়া কোনো স্থাপনা নির্মাণ বা পৃথক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।
গত রোববার সংস্কার শেষে ডাকসু সংগ্রহশালা উদ্বোধন করা হয়। সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক বা গৌরবোজ্জ্বল ছবি না থাকলেও মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি রাখা হয়েছে বলে জানা যায়। এর মধ্যে একটি ছবিতে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে এক অনুষ্ঠানে জিন্নাহর বক্তব্য দেওয়ার দৃশ্য রয়েছে। ওই অনুষ্ঠানে তিনি উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বক্তব্য দিয়েছিলেন।
জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর এ নিয়ে প্রতিবাদ শুরু হয়। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এক বিবৃতিতে ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি রাখার সমালোচনা করে। সংগঠনটি অভিযোগ করে, ডাকসুর বর্তমান পরিষদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তির প্রতি অনুরাগ প্রকাশ পাচ্ছে।
এরপর সোমবার দুপুরে ডাকসু সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানান শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক একজন ব্যক্তির ছবি ডাকসুর সংগ্রহশালায় কেন রাখা হয়েছে।
এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনসংযোগ দপ্তরের উপপরিচালক ফররুখ মাহমুদের পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ডাকসু-সংক্রান্ত কয়েকটি সংবাদ কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। এসব কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
প্রশাসন বলেছে, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন ব্যক্তিদের ছবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একই সঙ্গে ডাকসুর স্থাপন করা ‘নির্ভীক জুলাই’ স্মৃতিস্তম্ভ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে। প্রশাসনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত ২ সেপ্টেম্বর কলাভবনসংলগ্ন ডাকসু ভবনের পশ্চিম পাশে ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট বা উপাচার্যের অনুমতি নিয়ে কিংবা তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে স্থাপন করা হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি তদারকি, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সিন্ডিকেটের ওপর ন্যস্ত। একই সঙ্গে ছাত্র সংসদের যেকোনো সিদ্ধান্ত উপাচার্যের নির্দেশনা সাপেক্ষে নেওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন ছাড়া স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগকে প্রশাসন ‘এখতিয়ারবহির্ভূত’ বলে উল্লেখ করেছে।
তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিজেদের অবস্থানও স্পষ্ট করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, প্রশাসন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ধারণ ও লালন করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৫ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মলচত্বরে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে ওই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য ডাকসুর পক্ষ থেকে চালু করা ওয়েবসাইট নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। প্রশাসনের বক্তব্য, শিক্ষক মূল্যায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালা রয়েছে এবং তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুমোদিত হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ বলছে, অনুমোদিত নীতিমালার বাইরে গিয়ে কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা ছাত্র সংসদ নিজেদের উদ্যোগে পৃথক শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করতে পারে না। ডাকসুর চালু করা ওয়েবসাইটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশাসনের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ওই ওয়েবসাইটে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, যা আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা বাস্তবায়নের পথে রয়েছে বলেও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ডাকসুর সাম্প্রতিক এসব কর্মকাণ্ডকে শুধু পৃথক কয়েকটি ঘটনা হিসেবে দেখছে না। বরং এগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘দ্বৈত প্রশাসন প্রতিষ্ঠার’ চেষ্টা হিসেবে দেখছে তারা।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ডাকসু ছাত্রদের প্রতিনিধিত্বশীল গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলেও তার কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্তৃত্বকে পাশ কাটিয়ে কোনো সমান্তরাল কাঠামো বা প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আরও জানিয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা, বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের মর্যাদা রক্ষায় তারা কোনো আপস করবে না। অনুমোদন ছাড়া কোনো স্থাপনা নির্মাণ কিংবা পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে এসব বিষয়ে ডাকসু কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিবৃতিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তার নির্দিষ্ট ধরন বা সময়সীমাও উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এখন নজর থাকবে প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ডাকসুর পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের জবাবের দিকে।