আতঙ্কে সিঁড়িতে হুড়োহুড়ি, আহত হওয়ার তথ্য; দুই রোগীর স্বজনের দাবি, সিঁড়িতে পড়ে মৃত্যু
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (মমেক) নতুন ভবনের অষ্টম তলায় আগুন লাগার পর আতঙ্কে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে হুড়োহুড়ির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় কয়েকজন আহত হয়েছেন। তবে আগুনের পর পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে—এমন তথ্য নাকচ করেছে প্রশাসন। তাদের দাবি, এখন পর্যন্ত চারজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে এবং তাঁদের কেউ পদদলিত হয়ে মারা গেছেন—এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি।
সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির ও ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ। বিভাগীয় কমিশনার বলেন, ‘পদদলিত হয়ে ছয়জন মারা গেছেন—এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ আমরা এখন পর্যন্ত পাইনি। আমরা ফায়ার সার্ভিস, জরুরি বিভাগের চিকিৎসক, নার্স ও অন্য কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁদের রেজিস্টারও যাচাই করেছি। পদদলিত হয়ে মৃত্যুর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’ বিভাগীয় কমিশনার জানান, মৃত ব্যক্তিদের একটি তালিকায় পাঁচজনের নাম ছিল। তাঁদের মধ্যে একজন জীবিত এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাকি চারজনের মধ্যে দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে তাঁদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। অপর দুজনের মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে স্বাভাবিকভাবে রোগী মারা যেতে পারেন। তবে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর তথ্যটি অসত্য।’
আগুন লাগার পর হাসপাতালের বিভিন্ন তলায় ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। এ সময় অনেকে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন। হুড়োহুড়ির মধ্যে কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানান বিভাগীয় কমিশনার। তাঁদের কারও হাত-পা কেটে যাওয়া বা মাথায় আঘাত লাগার মতো ঘটনা ঘটতে পারে বলেও তিনি জানান। আগুনের ধোঁয়ায় কারও মৃত্যু হয়েছে কি না, সে বিষয়েও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
এর আগে অগ্নিকাণ্ডের পর ছয়জন পদদলিত হয়ে মারা গেছেন বলে বিভিন্ন জায়গায় তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। মৃত ব্যক্তিদের একটি তালিকাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন সেই তথ্য যাচাই শুরু করে। সংসদ সদস্য ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সহসভাপতি আবু ওয়াহাব আকন্দ বলেন, তালিকায় থাকা একজন রোগীকে জীবিত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, ‘জাহানারা নামে যে রোগীর নাম মৃতের তালিকায় দেওয়া হয়েছে, তিনি জীবিত। তিনি এখনো চিকিৎসা নিচ্ছেন। তালিকার সঙ্গে বাস্তবতা মিলিয়ে দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।’
তবে প্রশাসনের বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্ন দাবি করেছেন দুই মৃত রোগীর স্বজন। তাঁদের ভাষ্য, আগুনের পর আতঙ্কে লোকজনের দৌড়াদৌড়ি ও ধাক্কাধাক্কির মধ্যে সিঁড়িতে পড়ে তাঁদের স্বজনদের মৃত্যু হয়েছে।
তারাকান্দার বালিখা গ্রামের বাসিন্দা কুলসুম আক্তার (৩৫) প্রায় ১২ দিন ধরে অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ছিলেন। তাঁর ১২ বছর বয়সী ছেলে স্বাধীন জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিল। কুলসুমের সঙ্গে তাঁর ১৮ বছর বয়সী মেয়ে মিমও ছিলেন।
কুলসুমের ননদ নাজমা আক্তার বলেন, আগুন লাগার পর হাসপাতালের ভেতরে লোকজন ছোটাছুটি শুরু করলে কুলসুম তাঁর ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন। মিম আগে বের হয়ে যান। পরে তিনি ফিরে এসে দেখেন, লোকজন তাঁর ভাই স্বাধীনকে টেনে বের করছেন। কিন্তু তাঁর মাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। নাজমার ভাষ্য, পরে কুলসুমকে উদ্ধার করে অক্সিজেন দেওয়া হয়। তখনো তাঁর শ্বাস চলছিল। খবর পেয়ে তিনি হাসপাতালে আসার পথে ছিলেন। এর মধ্যেই কুলসুমের মৃত্যু হয়। নাজমা বলেন, ‘আমাদের অভিযোগ আছে।’ হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে তাঁরা কুলসুমের মরদেহ বাড়িতে নিয়ে গেছেন বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে ফুলপুরের রাঙামাটিয়া ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর গ্রামের শাহাজাহান মনির (৪৫) প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন ধরে হাসপাতালের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় যক্ষ্মার চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তাঁর ছেলে পলাশ মোল্লার দাবি, আগুন লাগার সময় তাঁর বাবা, মা হারিসা আক্তার ও খালা জাহানারা আক্তার একসঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলেন। পলাশের ভাষ্য, এ সময় পেছন থেকে লোকজনের ধাক্কায় তাঁরা পড়ে যান। পরে তাঁর মা ও খালাকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁরা বর্তমানে হাসপাতালের ১০ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। পলাশ বলেন, তিনি তখন হাসপাতালে ছিলেন না। পরে এসে মায়ের কাছে যান। তাঁর বাবার মরদেহ স্বজনেরা বাড়িতে নিয়ে গেছেন। মুঠোফোনে বাবার মরদেহের ছবি দেখেছেন তিনি।
তবে প্রশাসন বলছে, চারজনের মৃত্যুর ঘটনায় এখন পর্যন্ত পদদলিত হয়ে মৃত্যুর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয় সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলায়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, সন্ধ্যা ৫টা ৫৫ মিনিটে তাঁরা আগুন লাগার খবর পান। খবর পাওয়ার প্রায় ১০ মিনিটের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন।
ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি স্টেশনের ১০টি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে অতিরিক্ত ইউনিটগুলো সরিয়ে নেওয়া হলেও চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে রাখা হয়।
ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী বলেন, হাসপাতালের নতুন আটতলা ভবনের একটি লিফটের কন্ট্রোল রুমে থাকা কন্ট্রোলার মেশিনের সঙ্গে যুক্ত বোর্ডে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে অতিরিক্ত উত্তাপের কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আগুনের প্রকৃত কারণ তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। তিনি বলেন, কন্ট্রোল রুমে আগুন লাগায় ভবনের বিভিন্ন তলায় ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের পরিমাণ বড় না হলেও ধোঁয়ার কারণে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন খানও প্রাথমিকভাবে লিফটের মেশিন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক রয়েছে এবং হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমও সচল আছে। অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে বলেও জানান তিনি।
হাসপাতালের দুটি সিঁড়ির মধ্যে একটি বন্ধ থাকায় রোগী ও স্বজনেরা একটি সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে হুড়োহুড়িতে পড়েছিলেন—এমন অভিযোগও উঠেছে। এ বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, বিষয়টি তাঁরা জেনেছেন। নিরাপত্তার কারণে হাসপাতালের কিছু সিঁড়ি বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তবে হাসপাতালে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে।
অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতালের ভেতরে আতঙ্কের যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের বক্তব্যে তার কিছুটা চিত্র পাওয়া যায়। ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগী ও স্বজনদের অনেকে দ্রুত নিচে নামার চেষ্টা করেন। এতে হুড়োহুড়ি ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।
তবে এখন পর্যন্ত প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হলো—পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। চারজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেলেও তাঁদের মৃত্যুর কারণের বিষয়ে দুজনের ক্ষেত্রে পরিবারের বক্তব্য পাওয়া গেছে এবং অপর দুজনের মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করতে তদন্ত প্রয়োজন।
ফলে অগ্নিকাণ্ডের পর ছড়িয়ে পড়া ছয়জনের পদদলিত হয়ে মৃত্যুর খবরের সঙ্গে প্রশাসনের বক্তব্যের মধ্যে যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে এখন তদন্ত ও হাসপাতালের নথি যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে আগুনের সূত্রপাত, হাসপাতালের সিঁড়ি ব্যবস্থাপনা এবং আতঙ্কের সময় রোগী ও স্বজনদের নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসছে।