চট্টগ্রামে দুই ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে জুয়া মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে নগদ টাকা ও ক্রিপ্টোকারেন্সি আদায়ের অভিযোগ; তদন্তে সিএমপির কমিটি
চট্টগ্রামে এক ব্যবসায়ী ও তাঁর বন্ধুকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে জুয়া মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে নগদ টাকা ও ক্রিপ্টোকারেন্সি আদায়ের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) দুই সহকারী উপপরিদর্শককে (এএসআই) ক্লোজড করা হয়েছে। একই ঘটনায় ল’ফুল ইন্টারসেপটেড সেলের (এলআইসি) এক সহকারী কমিশনারকে প্রত্যাহার করে দামপাড়া পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।
তবে অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তাধীন। সিএমপি কমিশনার জানিয়েছেন, তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ক্লোজড হওয়া দুই এএসআই হলেন সিএমপির এলআইসির বাছির উদ্দিন ও সিএমপি রেশন স্টোরে কর্মরত সুফিয়ান। আর এলআইসির সহকারী কমিশনার শরিফুল আলম সুজনকে তাঁর দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে দামপাড়া পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, এক যুবকের কাছ থেকে টাকা ও ক্রিপ্টোকারেন্সি আদায়ের অভিযোগে দুই এএসআইকে ক্লোজড করে দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। একই অভিযোগের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনারকেও প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।
সিএমপি কমিশনার বলেন, ‘বিষয়টি তদন্ত করছেন উপকমিশনার (ডিসি) মো. বদিউজ্জামান। তাঁকে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। যেই জড়িত থাকুক, তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৪ সেপ্টেম্বর সকালে এসি শরিফুল আলমের নেতৃত্বে সাদা পোশাকের একদল পুলিশ নগরের হালিশহরের কে ব্লকের একটি বাসা থেকে ব্যবসায়ী আখতারুজ্জামান শাকিল (২৭) ও তাঁর বন্ধু মনসুর আলীকে তুলে নেয়। পরে তাঁদের একটি টয়োটা করোলা গাড়িসহ এলআইসি কার্যালয়ে নেওয়া হয় বলে দাবি করেন দুই ভুক্তভোগী।
আখতারুজ্জামান শাকিল চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে পলিপ্রোপিলিন বা পিপি দানার ব্যবসা করেন। পাশাপাশি পটিয়ায় তাঁর একটি কৃষি খামার রয়েছে। তাঁর বন্ধু মনসুর আলী গাড়ির যন্ত্রাংশের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
দুই ভুক্তভোগীর অভিযোগ, এলআইসি কার্যালয়ে নেওয়ার পর তাঁদের মোবাইল ফোন জব্দ করে তল্লাশি চালানো হয়। ফোনে থাকা ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি অন্য একটি ডিভাইসে স্থানান্তর করা হয় বলেও তাঁদের দাবি।
শাকিল ও মনসুরের ভাষ্য অনুযায়ী, শাকিলের ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশ করে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। একই সঙ্গে তাঁদের বিরুদ্ধে জুয়া মামলা দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তাঁরা। এ ঘটনায় এসি শরিফুল আলম সুজন ও এএসআই বাছির উদ্দিনের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।
শাকিলের দাবি, তাঁর বাইন্যান্স অ্যাকাউন্ট থেকে তিন দফায় মোট ১০ হাজার ৮৬৪ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ক্রিপ্টোকারেন্সি বিভিন্ন মাধ্যমে স্থানান্তর করতে বাধ্য করা হয়। তাঁর হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর মূল্য প্রায় ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ৪ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে তিন কনস্টেবল তাঁকে সিএমপির কাছাকাছি একটি ব্যাংকের এটিএম বুথে নিয়ে যান। সেখানে পাঁচ দফায় তাঁর কাছ থেকে মোট ৪ লাখ টাকা তোলা হয়।
এ ছাড়া এলআইসি কার্যালয়ে অবস্থানের সময় তাঁর একটি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্ট থেকে আরও ৮০ হাজার টাকা স্থানান্তর করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন শাকিল।
নগদ অর্থ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি মিলিয়ে প্রায় ১৮ লাখ টাকা মূল্যের সম্পদ আদায়ের অভিযোগ তুলেছেন তিনি। তবে এসব অর্থ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি কার কাছে, কীভাবে এবং কোন অ্যাকাউন্টে গেছে—সেসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
দুই ভুক্তভোগীর দাবি, পুলিশ সদস্যরা একটি সাদা কাগজে তাঁদের নাম, ঠিকানা ও মুঠোফোন নম্বর লিখে নেন এবং তাতে তাঁদের স্বাক্ষর করান। পরে তাঁদের ভিডিও ধারণ করা হয়। রাত ১২টার দিকে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হলেও পরদিন ৫ সেপ্টেম্বর রাতে ব্যক্তিগত গাড়ি ফেরত দেওয়ার সময় আরও ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর বিষয়টি তদন্তে কমিটি গঠন করে সিএমপি। শাকিল জানান, তিনি পরে তদন্ত কমিটির কাছে মৌখিকভাবে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।
চট্টগ্রামে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ক্রিপ্টোকারেন্সি আদায়ের অভিযোগ নতুন নয়। এর আগে ২০২৪ সালের ২৬ জানুয়ারি নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে ফ্রিল্যান্সার আবু বকরকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে।
পরে আবু বকর অভিযোগ করেন, মামলা ও ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যার ভয় দেখিয়ে তাঁর মুঠোফোন থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা মূল্যের বিটকয়েন স্থানান্তর করে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় তাঁর স্ত্রী আট পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্যদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন।
পরে সিএমপির অভ্যন্তরীণ তদন্তে ওই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছিল। এরপর একজন পরিদর্শকসহ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়।
সাম্প্রতিক ঘটনায়ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও সেটি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। তদন্তে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের লেনদেন, ক্রিপ্টোকারেন্সি স্থানান্তরের তথ্যসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রমাণ যাচাইয়ের পরই অভিযোগের সত্যতা এবং কার কী ভূমিকা ছিল, তা নির্ধারণ হবে।
বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন অনুমোদিত নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২২ সালের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭ অনুযায়ী ভার্চুয়াল মুদ্রা কোনো ধরনের বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন নিষ্পত্তি বা বিনিয়োগের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক অনুমোদিত নয়। তবে কোনো লেনদেন অবৈধ বা অননুমোদিত হলেও ব্যক্তিকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ বা সম্পদ আদায়ের অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন ও অভিযোগের বিষয়গুলো পৃথকভাবে তদন্তের আওতায় পড়ে।