ফেরার টিকিট কেটেও নমপেন বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে আটকে পড়ার অভিযোগ; দেশটিতে গত দেড় বছরে গেছেন প্রায় ১৬ হাজার বাংলাদেশি
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফেরার জন্য টিকিট কেটেও নমপেন বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে আটকে পড়েছেন ৩২ বাংলাদেশি। পরে তাঁদের কম্বোডিয়ার ইমিগ্রেশন পুলিশের ডিটেনশন সেন্টারে নেওয়া হয়েছে। সেখানে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের যোগাযোগ হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনেরা। তাঁদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন তাঁরা।
ফেনীর মহিপালের জাহিদুল ইসলাম প্রায় এক বছর আগে হিমেল নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে ছয় লাখ টাকা খরচ করে কম্বোডিয়ায় যান। ভালো চাকরির আশায় গিয়ে সেখানে একটি স্ক্যাম সেন্টারে দুই মাস কাজ করেন। এরপর দীর্ঘ সময় বেকার ছিলেন। দেশে ফেরার জন্য আবেদন করে কাজের পাওনা বুঝে নেওয়ার পর গত ৩ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরার টিকিট কাটেন তিনি। সেদিন নমপেন বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে যাওয়ার পর ঢাকায় থাকা স্ত্রী সুমা আক্তারের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। সুমা বলেন, ‘সেদিনের পর থেকে স্বামীর সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারিনি। মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পেরেছি, আরও ৩১ জন বাংলাদেশির সঙ্গে জাহিদুলও এক জায়গায় আটকে আছেন।’ তাঁরা কবে দেশে ফিরতে পারবেন, সে বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান তিনি।
একইভাবে দেশে ফেরার কথা ছিল গাজীপুরের কালীগঞ্জের শাওনের। তাঁর মা আসমা বেগম জানান, কম্পিউটার অপারেটরের চাকরির কথা বলে ২০২৫ সালের এপ্রিলে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে শাওনকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়। শান্ত নামের এক ব্যক্তি তাঁকে সেখানে পাঠান। তবে গিয়ে শাওন প্রত্যাশিত কাজ পাননি। পরে স্ক্যাম সেন্টার থেকে বের হওয়ার জন্য পরিবারের কাছ থেকে আরও ৯৫ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে দাবি করেন তাঁর মা। আসমা বলেন, গত ৩ সেপ্টেম্বর শাওনের দেশে ফেরার কথা ছিল। ৪ সেপ্টেম্বর ফোন করে শাওন তাঁকে বলেছিলেন, ‘ইমিগ্রেশনে আছি আমরা, ইমিগ্রেশন পুলিশ হেফাজতে আছি। কখন আমাদের ফ্লাইট দিব কিছুই জানি না।’ এরপর থেকে তাঁর মোবাইল বন্ধ। যে ব্যক্তি তাঁকে কম্বোডিয়ায় পাঠিয়েছিলেন, তাঁর ফোনও বন্ধ বলে জানান আসমা।
অনিয়মিত অভিবাসন ও মানবপাচারের পুরোনো সংকটের সঙ্গে গত কয়েক বছরে কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও মিয়ানমারে গড়ে ওঠা সাইবার স্ক্যাম সেন্টার নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এসব দেশে নেওয়ার পর অনেক বাংলাদেশিকে জোর করে অনলাইন প্রতারণার কাজে যুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, আটকে রাখা এবং পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
কম্বোডিয়া সরকার গত জুনে জরিমানা ছাড়া অতিরিক্ত সময় অবস্থানরত বিদেশিদের স্বেচ্ছায় নিজ নিজ দেশে ফেরার সুযোগ দেয়। ওই মাসে ৫৮৩ জন বাংলাদেশি দেশে ফেরেন। পরে ব্যাংককে বাংলাদেশ দূতাবাসের অনুরোধে কম্বোডিয়া সরকার বিনা জরিমানায় ফেরার সময়সীমা ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ায়। এরপর গত ৩ সেপ্টেম্বর আরও ৩৮ জন বাংলাদেশি কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফেরেন।
তবে একই দিনে দেশে ফেরার টিকিট কেটে নমপেন বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে অপেক্ষায় থাকা ৩২ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিবার ও দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে। পরে তাঁদের ইমিগ্রেশন পুলিশের ডিটেনশন সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানে থাকা একাধিক বাংলাদেশির পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের সঙ্গে বর্তমানে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না।
ব্যাংককে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) জহির ইমাম বলেন, ‘দূতাবাসের পক্ষ থেকে আমরা কম্বোডিয়ার সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি, যাতে ওই ৩২ জনকে দ্রুত দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। তাঁদের সেখানকার ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টারে আটকে রাখা হয়েছে। সেখানে ফোন ব্যবহারের সুযোগ নেই। তাই তাঁরা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না।’ তিনি জানান, স্থানীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে আটক ব্যক্তিদের জন্য খাবার পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে।
তবে শুধু এই ৩২ জনই নন, কম্বোডিয়া সরকারের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশে ফেরার জন্য ব্যাংককে বাংলাদেশ দূতাবাসের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন অন্তত ১ হাজার ৭৯৬ জন। তাঁদের বড় একটি অংশ বিভিন্ন স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলেন বলে দূতাবাস ও অভিবাসনসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য।
দূতাবাসের নির্দেশনায় দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা এসব বাংলাদেশি ফেরতযোগ্য টিকিটও কিনেছিলেন। এখন তাঁদের অনেককে ওই টিকিট রিফান্ড করতে বলা হচ্ছে। কেন তাঁরা নির্ধারিত সময়ে দেশে ফিরতে পারলেন না এবং টিকিটের অর্থ পুরোপুরি ফেরত পাবেন কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জহির ইমাম বলেন, বিভিন্ন উপায়ে কম্বোডিয়ায় যাওয়া লোকজনও দূতাবাসের ফেরত আসার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। পরে কম্বোডিয়ার কর্তৃপক্ষ তাঁদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় কারও কারও প্রবেশের প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতি পাচ্ছে। তখন বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাঁদের দেশে ফেরাতে দূতাবাস সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বলেও জানান তিনি।
কম্বোডিয়া থেকে ৩ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরা কয়েকজন বাংলাদেশি অভিযোগ করেছেন, তাঁদের দেশে ফেরার পথেও সেখানে থাকা দালালচক্রের সদস্যরা বাধা দিয়েছিলেন এবং ভয়ভীতি দেখিয়েছিলেন।
নরসিংদীর মাজহারুল ইসলাম তাঁদের একজন। কম্পিউটার অপারেটরের চাকরির কথা বলে আলিফ ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির মাধ্যমে গত বছরের ৩০ অক্টোবর তাঁকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, তাঁকে একটি স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করতে হবে। কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে নমপেনে আটকে রাখা হয় বলে অভিযোগ তাঁর।
প্রায় ১১ মাস পর গত ৩ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরেন মাজহার। তাঁর দাবি, দালালদের কারসাজির কারণে দেশে ফিরতে অতিরিক্ত দুই মাস সময় লেগেছে। দেশে ফেরার পর বাংলাদেশ বিমানবন্দরে সিআইডি তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন জব্দ করেছে বলেও জানান তিনি। ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান মাজহার।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মকর্তারা বলছেন, কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত কিছু বাংলাদেশি মানবপাচারকারীও প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের দেশে ফেরার পথে ভয়ভীতি দেখান ও চাপ দেন। উন্নত দেশে বেশি বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাঁদের কম্বোডিয়ায় নেওয়ার পর অনলাইনে প্রতারণামূলক কাজে যুক্ত করা হয়। অনেককে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে ১৫ হাজার ৯২১ বাংলাদেশি চাকরির আশায় কম্বোডিয়ায় গেছেন। গত জুনে দেশে ফেরা ৫৮৩ জনের অনেকের কাছেই বিএমইটির ছাড়পত্র ছিল। ভুক্তভোগীদের দাবি, বৈধ কাগজপত্র ও বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে যাওয়ার পরও কম্বোডিয়ায় গিয়ে তাঁদের কেউ কেউ স্ক্যাম সেন্টারে আটকা পড়েছেন।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য বলছে, কম্পিউটার অপারেটর, কল সেন্টার এক্সিকিউটিভ ও কাস্টমার সার্ভিসসহ বিভিন্ন পদের চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে ভুয়া ওয়েবসাইট, ই-মেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহ করা হয়। পরে তাঁদের জোর করে অনলাইন প্রতারণার কাজে যুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি প্রায় চার বছর স্ক্যাম সেন্টারে থাকার পর কৌশলে দেশে ফেরা এক বাংলাদেশি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়া—দুই দেশেই মানবপাচারকারী চক্র সক্রিয়। বাংলাদেশি চক্র চাকরির কথা বলে লোক পাঠানোর পর কম্বোডিয়ার চক্র তাঁদের গ্রহণ করে এবং অনেক ক্ষেত্রে চীনা চক্রের হাতে তুলে দেয়। পরে পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন নিয়ে তাঁদের স্ক্যাম সেন্টারে রাখা হয়। সেখানে ফিশিং লিংক, ব্ল্যাকমেইলিং ও হানিট্র্যাপসহ বিভিন্ন ধরনের সাইবার প্রতারণায় বাধ্য করা হয় বলে জানান তিনি।
ওই ব্যক্তি বলেন, দেশে ফিরতে চাইলে অনেকের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়। টাকা দেওয়ার পরও তাঁদের কয়েক মাস আটকে রাখা হয় এবং স্ক্যাম সেন্টারে কী কাজ করেছেন, তা প্রকাশ করলে প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
এর আগে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের একটি সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে আটজন এবং ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর আরও ১৮ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছিলেন। তাঁদেরও ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে থাইল্যান্ড সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারে নেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন। সেখানে তাঁদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন নিয়ে জোর করে সাইবার প্রতারণায় যুক্ত করা হয়।
কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশি দূতাবাস না থাকা সত্ত্বেও গত দেড় বছরে প্রায় ১৬ হাজার বাংলাদেশি কীভাবে দেশটিতে গেলেন, তাঁদের নিয়োগদাতা ও নিয়োগপ্রক্রিয়া কী ছিল, বিমানবন্দরে যাচাই-বাছাই কীভাবে হয়েছে এবং বিএমইটি থেকে কীভাবে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে—এসব প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মকর্তারা পুরো প্রক্রিয়া তদন্তে জনশক্তি, স্বরাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে আলাদা তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, যারা জেনে বা স্বেচ্ছায় স্ক্যাম সেন্টারের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছেন এবং মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত দালালচক্র—উভয় পক্ষকেই চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, কম্বোডিয়ায় আটকা পড়া বাংলাদেশিদের বিষয়ে এই মুহূর্তে সরকারের কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। এ বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন থেকে কম্বোডিয়ার ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও বেশি যাচাই-বাছাই এবং কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যেহেতু সেখানে গিয়ে অনেকেই স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন, তাই আমরা এ পদক্ষেপ নিচ্ছি।’