স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে প্রস্তুতি দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা, সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ, আইন ও বিধি সংশোধন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনাসহ নির্বাচন আয়োজনের প্রাথমিক কাজগুলো অক্টোবরের মধ্যেই শেষ করতে চায় কমিশন। সব প্রস্তুতি শেষ করে নভেম্বরের শুরুতেই স্থানীয় সরকারের কোনো একটি স্তরের ভোট দিয়ে নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন—স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে কোন স্তরের নির্বাচন দিয়ে ভোট শুরু হবে, সে সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন দিয়ে শুরু করার বিষয়ে কমিশনের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। আবার পৌরসভা নির্বাচন দিয়েও ভোটের সূচনা করা যায় কি না, তা বিবেচনা করা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের সব কর্মপরিকল্পনা অক্টোবরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর নভেম্বর থেকে ভোট শুরু করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ভোটের প্রস্তুতিমূলক কাজ, বাজেট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা পর্যালোচনা করেই ভোটের তারিখ নির্ধারণ করা হবে।
কমিশন সূত্র বলছে, নভেম্বর থেকে আগামী এপ্রিল পর্যন্ত ছয় মাসকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য সম্ভাব্য সময় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ইসি। নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন হলেও স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে মাঠ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুতির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
ইতিমধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের নতুন আচরণবিধির খসড়ায় আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচন পরিচালনা বিধি ও সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের কাজও চলছে। কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী মাসে এসব আইন ও বিধির সংশোধন শেষ করার পর নভেম্বরের শুরুতে ভোটের সময়সূচি দেওয়া হতে পারে।
ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকারের ভোট শুরু হলে তফসিল ঘোষণার পর ভোট গ্রহণের জন্য প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ দিন সময় রাখার বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে কমিশনের সভায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্রের তালিকাও প্রস্তুত করা হচ্ছে। কমিশন চলতি মাসের মধ্যেই ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করার পাশাপাশি সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্রের তালিকা চূড়ান্ত করতে চায়। ভোটকেন্দ্র নির্ধারণের পর সেগুলোর উপযোগিতা, যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপত্তা এবং ভোটারদের সুবিধার বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হবে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, ভোট গ্রহণের দায়িত্বে থাকা পুলিশ, বিজিবি ও আনসারের প্রস্তুতির বিষয়টি দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে স্কুল-কলেজের শিক্ষক এবং ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর ভোটের দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও এরই মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এবং বিজিবির মহাপরিচালক নির্বাচন ভবনে গিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন এবং সর্বশেষ পরিস্থিতি জানিয়েছেন। শিগগিরই নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরও একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে সরকারের সঙ্গেও আলোচনা করতে যাচ্ছে ইসি। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম মঙ্গলবার জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করবেন তিনি। ভোটের সময়, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয় সেখানে আলোচনায় আসতে পারে।
এর মধ্যে বৃহস্পতিবার নতুন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত করা হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতির বিষয়টিও সেখানে তুলে ধরা হতে পারে।
পাঁচ বছর মেয়াদি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় সব কটিই এখন নির্বাচনযোগ্য হয়ে পড়েছে। ফলে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আয়োজন কমিশনের জন্য বড় ধরনের প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ কারণে ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
দেশে সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হয়েছিল ২০২১ সালের এপ্রিল, নভেম্বর ও ডিসেম্বর এবং ২০২২ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে সাত ধাপে। প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদ বর্তমানে নির্বাচন উপযোগী।
পৌরসভাগুলোর সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২১ সালের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও এপ্রিলে ছয় ধাপে। দেশে মোট পৌরসভা রয়েছে ৩৩০টি।
উপজেলা পরিষদের সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২৪ সালের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত চার ধাপে। পরে স্থগিত নির্বাচনগুলো নিয়ে আরও একটি বিশেষ ধাপ অনুষ্ঠিত হয়। দেশে উপজেলা পরিষদ রয়েছে প্রায় ৫০০টি এবং এর প্রায় সবই এখন নির্বাচন উপযোগী।
সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচনও বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ২০২১ সালের জানুয়ারিতে চট্টগ্রাম সিটি, ২০২২ সালের জুনে কুমিল্লা এবং ডিসেম্বরে রংপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হয়। ২০২৩ সালের মে মাসে গাজীপুর, জুনে খুলনা ও বরিশাল এবং পরে রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের মার্চে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে ভোট হয়। চলতি বছর মে মাসে বগুড়া সিটি করপোরেশন গঠিত হয়েছে।
স্থানীয় সরকারের চার স্তরের সরাসরি নির্বাচন শেষ হওয়ার পর জেলা পরিষদের নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টিও সামনে আসবে। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য নির্বাচন পরোক্ষ ভোটে অনুষ্ঠিত হয়।
সব মিলিয়ে ইসির সামনে এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো বিপুলসংখ্যক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনকে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার আওতায় আনা। অক্টোবরের মধ্যে প্রস্তুতি শেষ করার লক্ষ্য পূরণ করতে হলে আগামী দুই মাসে ভোটকেন্দ্র, আইন-বিধি, বাজেট, জনবল, প্রশিক্ষণ এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনার কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে।
ইসির পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নভেম্বরেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভোট শুরু হতে পারে। তবে কোন প্রতিষ্ঠান দিয়ে শুরু হবে, একসঙ্গে কতগুলো এলাকায় ভোট হবে এবং কোন কোন ধাপে নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে কমিশনের পরবর্তী বৈঠক ও সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর।