বর্তমান সরকারের কাছ থেকে দেশের মানুষ ‘মুক্তি’ চায় বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনের আগে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। তাঁর ভাষায়, সরকারের কর্মকাণ্ডে মানুষ অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েছে। শনিবার দুপুরে কুমিল্লার পদুয়া বাজার এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শফিকুর রহমান এসব কথা বলেন। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচারসহ ছয় দফা দাবিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে এই লংমার্চ কর্মসূচি পালন করছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।
পথসভায় বক্তব্যের শুরুতেই কুমিল্লাকে দ্রুত বিভাগ করার দাবি জানান জামায়াতের আমির। একই সঙ্গে কুমিল্লা বিমানবন্দর চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের আহ্বান জানান তিনি। শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৯৪ সালে সিলেট বিভাগ করার সময় একই সঙ্গে কুমিল্লাকে বিভাগ করার দাবি উঠেছিল। কিন্তু তখন কুমিল্লা বিভাগ হয়নি। কুমিল্লাবাসীর কী অপরাধ—প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, বিভাগ করার বিষয়টি নিয়ে আর ‘ধানাই-পানাই’ না করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি বলেন, বৃহত্তর নোয়াখালীও বিভাগ চায়। তারাও বিভাগ পাওয়ার দাবিদার। তবে আগে কুমিল্লাকে বিভাগ করার দাবি বাস্তবায়ন করা উচিত। কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, ‘কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই ভালো! চাঁদাবাজ নাই! আছে?’ এরপর তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
লংমার্চ কর্মসূচি প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, কুমিল্লার পর পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে লংমার্চ হবে। পরে ঢাকায় মহাসমাবেশ করা হবে। দাবি আদায়ের ওই কর্মসূচিতেও কুমিল্লার মানুষকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পথসভায় জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, সরকারের মন্ত্রীদের সন্তান, পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের অনেকে দুর্নীতি ও বিভিন্ন সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে বলে দাবি করেন তিনি। নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারের ওপর মানুষ ‘বিরক্ত’। গত ছয় মাসে সরকার দেশ পরিচালনায় ‘সম্পূর্ণ ব্যর্থ’ হয়েছে। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর কোনোটি সরকার রাখতে পারেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এর আগে সকালে ঢাকার শাপলা চত্বরে লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশেও বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলাম। সেখানে তিনি বলেন, লংমার্চ শান্তিপূর্ণভাবে পালন করা হবে। সরকার এতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে ছয় দফা দাবি ‘এক দফায়’ পরিণত হতে পারে।
লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, জনগণের বক্তব্য শুনতে হবে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষ বর্তমান সরকারকে আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না বলে তিনি দাবি করেন। সরকারের সমালোচনা করে অলি আহমদ বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, মাস্তানি, জায়গা দখল, নেতা-কর্মীদের হয়রানি ও মাদকের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, দেশকে ‘জাহান্নামে’ পরিণত করা হয়েছে। সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়েও মন্তব্য করেন এলডিপির সভাপতি। তিনি বলেন, মানুষের মুখে মুখে আছে যে ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারের পতন হবে। সরকার কিছু করুক বা না করুক, ‘নিজের ভারে নিজেই পড়ে যাবে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, জনগণের রায় বাস্তবায়ন করে জনদুর্ভোগ কমানোর উদ্যোগ নিতে সরকার ব্যর্থ হলে আন্দোলনের পরিধি আরও বাড়বে। তাঁর দাবি, জনতার এই মিছিল একসময় টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে এবং সেই গণস্রোতে সরকার ‘ভেসে যেতে বাধ্য হবে’। মামুনুল হক অভিযোগ করেন, ভোট ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে সরকার ক্ষমতায় এসেছে। দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলার স্বার্থে তাঁরা তা মেনে নিয়েছেন। তবে ৭০ শতাংশ মানুষের ‘হ্যাঁ’ ভোটের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণা চলতে থাকলে সরকারের পরিণতি অতীতের ফ্যাসিবাদী সরকারের মতো হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চকে সরকারের জন্য ‘ওয়েক-আপ কল’ বলে মন্তব্য করেছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। কুমিল্লার পদুয়া বাজারে পথসভায় তিনি বলেন, এই কর্মসূচি সরকার পতনের আন্দোলন নয়; জনগণের দাবি জানানো এবং সরকারকে সতর্ক করার কর্মসূচি।
পথসভায় আরও বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন পাটওয়ারী, এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম মাসুমসহ ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।
কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদের সভাপতিত্বে পথসভা পরিচালনা করেন মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মো. মাহবুবুর রহমান।
মহাসড়কে ধীরগতি যাত্রীরা ভোগান্তিতে
পদুয়া বাজারের পথসভাটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ঢাকামুখী লেনের পাশে অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী অংশ নেন। তাঁদের অনেকে মহাসড়কের পাশে অবস্থান নেওয়ায় ঢাকামুখী লেনে যান চলাচলে ধীরগতি সৃষ্টি হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। অন্যদিকে চট্টগ্রামমুখী লেনে লংমার্চের গাড়িবহর চলাচলের কারণে থেমে থেমে যানজট ও ধীরগতি দেখা দেয়। এতে যানবাহনের চালক ও যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন।
শনিবার সকালে ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ শুরু হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পথসভা শেষে কর্মসূচিটি চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে গিয়ে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
লংমার্চের ঘোষিত ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—অবিলম্বে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও অপরাধ দমন, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।