কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন আর শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধের বিষয় নয়। গত কয়েক বছরে সেখানে হত্যা, অপহরণ, মাদক পাচার, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সংগঠিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ক্যাম্পের পাহাড়ি অংশে অস্ত্রের মজুত, স্থানীয়ভাবে অস্ত্র তৈরির কারখানা এবং সীমান্ত ও সমুদ্রপথে বিদেশি অস্ত্র প্রবেশের তথ্য মিলিয়ে তৈরি হয়েছে একটি জটিল নিরাপত্তা বলয়।
২০২০ সালে কুতুপালংসহ কয়েকটি ক্যাম্পে ধারাবাহিক সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে যে বাস্তবতা স্পষ্ট হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে সেটি আরও জটিল হয়েছে। এখন শুধু একটি বা দুটি গোষ্ঠী নয়, একাধিক সশস্ত্র সংগঠন ও অপরাধী নেটওয়ার্ক ক্যাম্পের বিভিন্ন অংশে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। এর মধ্যে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি—আরসা, রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন—আরএসও এবং নবি হোসেনের নেতৃত্বাধীন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করেছে, সেই আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি—এআরএ অন্যতম। বিভিন্ন ছোট অপরাধী ও সশস্ত্র গ্রুপও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
২০২৫ সালে ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও ঝুঁকি শেষ হয়নি। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বছর ক্যাম্পে হত্যা ও গুরুতর হামলার ঘটনা ছিল ৬৪২টি। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৯০৯। অর্থাৎ ২৯ শতাংশ কমেছে। তবে ইউএনএইচসিআর একই সঙ্গে বলেছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও ভঙ্গুর। ২০২৪ সালের নভেম্বরে সংগঠিত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে হওয়া একটি সমঝোতা সহিংসতা কমাতে ভূমিকা রেখেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ সংখ্যা কমলেও ক্যাম্পে অস্ত্রের উপস্থিতি বা সংগঠিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্ষমতা শেষ হয়ে যায়নি। বরং গোষ্ঠীগুলোর কৌশল ও সম্পর্কের ধরন বদলেছে।

২০২০ সালের অক্টোবর ছিল ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতির একটি বড় মোড়। উখিয়ার কুতুপালং এলাকায় কয়েক দিন ধরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত আটজন নিহত হওয়ার তথ্য তখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সূত্রে উঠে আসে। সংঘর্ষের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাপক অভিযান শুরু করে। একই সময়ে অস্ত্রসহ রোহিঙ্গা আটকের ঘটনাও বাড়তে থাকে। তখনই প্রশ্ন ওঠে—২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা মানুষের সঙ্গে এত অস্ত্র কীভাবে ক্যাম্পে ঢুকল?
প্রথম দিকে একটি ধারণা ছিল, ২০১৭ সালের ব্যাপক অনুপ্রবেশের সময় নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে নতুন আসা মানুষের মালপত্র যথাযথভাবে তল্লাশি করা সম্ভব হয়নি। ফলে কিছু অস্ত্রধারীও সাধারণ শরণার্থীদের সঙ্গে ঢুকে থাকতে পারে। কিন্তু পরবর্তী কয়েক বছরের ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে, বিষয়টি শুধু ২০১৭ সালে অস্ত্র নিয়ে প্রবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং অস্ত্রের সরবরাহব্যবস্থা পরবর্তীকালে একটি আলাদা অপরাধী নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সময়ের অভিযানে দেখা গেছে, ক্যাম্পে পাওয়া অস্ত্রের একটি অংশ দেশীয় তৈরি। উখিয়া ও ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড়ে অস্ত্র তৈরির অস্থায়ী কারখানার সন্ধানও পাওয়া গেছে। ২০২০ সালে মধুরছড়া এলাকায় এমন একটি কারখানায় অভিযান চালিয়ে অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম ও দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের তথ্য প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়েও ক্যাম্পের আশপাশের পাহাড়ে অস্ত্র তৈরির কারিগর ও কারখানা শনাক্তের ঘটনা ঘটেছে। এতে একটি বিষয় স্পষ্ট—ক্যাম্পে অবৈধ অস্ত্রের সরবরাহের উৎস শুধু সীমান্তের ওপার নয়; স্থানীয় পর্যায়েও অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের ধরন আরও বড় প্রশ্ন তৈরি করে। ২০২২ সালে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকা থেকে একটি এম-১৬ রাইফেল ও বিপুল গুলি উদ্ধারের ঘটনা সামনে আসে। অর্থাৎ দেশীয় তৈরি একনলা বন্দুক বা এলজি-র পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত আধুনিক সামরিক অস্ত্রও কোনো কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে পৌঁছেছে।
২০২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি উখিয়ার ক্যাম্প-২০ এক্সটেনশনের পাহাড়ি এলাকায় র্যাবের অভিযানে তিনজনকে আটক করা হয়। র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা আরসার সদস্য। ওই অভিযানে ২২টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং শতাধিক গুলি উদ্ধারের কথা জানানো হয়। পরবর্তী প্রতিবেদনে চারটি মাইন উদ্ধারের কথাও আসে। ক্যাম্প-২০ এক্সটেনশন তাই অস্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হটস্পট হিসেবে সামনে আসে।
কিন্তু অস্ত্রগুলো কোথা থেকে আসে?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যে মিয়ানমার সীমান্ত, নাফ নদী, সমুদ্রপথ ও পাহাড়ি সীমান্তকে অস্ত্র পাচারের সম্ভাব্য রুট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মাদক পাচারের নেটওয়ার্কের সঙ্গে অস্ত্রের নেটওয়ার্কের যোগসূত্রের কথাও বারবার এসেছে। সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা বা অন্যান্য মাদক পাচারকারী চক্র তাদের সদস্যদের নিরাপত্তার জন্য অস্ত্র ব্যবহার করে—এমন তথ্যও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়েছে।
তবে মিয়ানমার থেকে আসা প্রতিটি অস্ত্রের উৎস বা কোন গোষ্ঠী তা সরবরাহ করছে, সেটি প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। একইভাবে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী কোনো নির্দিষ্টভাবে ক্যাম্পের কোনো গোষ্ঠীকে অস্ত্র সরবরাহ করছে—এমন অভিযোগও স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। এসব অভিযোগ তদন্তসাপেক্ষ।

ক্যাম্পে অস্ত্রের উপস্থিতির দ্বিতীয় বড় উৎস হলো স্থানীয় অপরাধী নেটওয়ার্ক। ২০২৪ সালের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উখিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে একের পর এক দেশীয় বন্দুক, কার্তুজ ও গুলি উদ্ধার হয়েছে। ক্যাম্প-৪, ক্যাম্প-১৩, ক্যাম্প-১৮সহ বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্রসহ আটকের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ সীমান্ত থেকে অস্ত্র ঢোকার পাশাপাশি ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড়ে তৈরি হওয়া অস্ত্রও অপরাধীদের হাতে যাচ্ছে। এই অস্ত্রের ব্যবহার সবচেয়ে ভয়াবহভাবে দৃশ্যমান হয়েছে হত্যাকাণ্ডে। ২০২১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা সমাজের পরিচিত নেতা মুহিব উল্লাহকে কুতুপালং এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয়। একই বছর ২২ অক্টোবর ক্যাম্প-১৮-এর একটি মাদ্রাসায় হামলায় ছয়জন নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ড ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়। এরপর ২০২২ ও ২০২৩ সালে হত্যাকাণ্ডের ধরন আরও সংগঠিত হয়ে ওঠে। কমিউনিটি নেতা, মাঝি, ধর্মীয় নেতা, কথিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য—বিভিন্ন পরিচয়ের মানুষ টার্গেটেড হামলার শিকার হন। এক পর্যায়ে আরসা ও আরএসও-র মধ্যকার সংঘর্ষ ক্যাম্পের সহিংসতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে উখিয়ার ক্যাম্পে দুই গোষ্ঠীর সংঘর্ষে দুইজন নিহত হওয়ার তথ্য দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী; একই বছরের একটি হিসাবে উখিয়ার ক্যাম্পগুলোতে ৫৮টি এবং টেকনাফে আটটি হত্যাকাণ্ডের কথা পুলিশ জানিয়েছিল।
২০২৪ সালে অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি গোষ্ঠীগত সংঘর্ষও অব্যাহত থাকে। ক্যাম্প-২০ এক্সটেনশনে একের পর এক অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা প্রমাণ করে, পাহাড়ি অংশগুলো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জন্য নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। জানুয়ারির অভিযানে ২২টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ২০২৪ সালের মে মাসেও একই এলাকায় অস্ত্র, গ্রেনেড ও বিস্ফোরক উদ্ধারের খবর আসে। এসব অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরসা-সংশ্লিষ্ট সদস্যদের আটক করার কথা জানায়।
এর মধ্যেই গোষ্ঠীগুলোর কাঠামো বদলাতে শুরু করে। একসময় ক্যাম্পে সবচেয়ে আলোচিত সশস্ত্র সংগঠন ছিল আরসা। পরে আরএসও আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাদের মধ্যে আধিপত্যের সংঘর্ষ শুরু হয়। এরপর নবি হোসেনের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী, যা বিভিন্ন সূত্রে আরা বা নবী হোসেন গ্রুপ নামে উল্লেখ করা হয়, সেই প্রতিযোগিতাকে আরও জটিল করে। ২০২৫ সালে এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত দেখা যায়। জুলাইয়ে ক্যাম্প-১১ থেকে একটি বিদেশি ইউজেডআই সাবমেশিনগানসহ আরা-সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে আটক করার খবর প্রকাশিত হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, অস্ত্রটি অন্য একটি ক্যাম্পে নেওয়ার কথা ছিল। এটি দেখায়, ক্যাম্পে অস্ত্রের বাজার কেবল স্থানীয়ভাবে তৈরি বন্দুকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বিদেশি ও আধুনিক অস্ত্রও সংগঠিত গোষ্ঠীগুলোর হাতে পৌঁছাচ্ছে।
২০২৬ সালে পরিস্থিতির আরেকটি পরিবর্তন দেখা গেছে। জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সীমান্তে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা সশস্ত্র রোহিঙ্গাদের একটি বড় দল আটক হওয়ার ঘটনা সীমান্ত ও ক্যাম্প নিরাপত্তার নতুন মাত্রা সামনে আনে। একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে আরসার কথিত এক কমান্ডারকে গ্রেপ্তারের খবরও আসে। অর্থাৎ ক্যাম্পের ভেতরের সশস্ত্র নেটওয়ার্কের সঙ্গে মিয়ানমারের চলমান যুদ্ধের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে কি না, সেটিও এখন বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
২০২৬ সালের মে মাসে ক্যাম্প-৮-এর কাছে মোহাম্মদ কামালকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটে। তিনি নবি হোসেনের ভাই বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে। ফলে এ হত্যাকাণ্ডকে নিছক ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ কমে যায়; গোষ্ঠীগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনাও তদন্তে আসে। আগস্টেও ক্যাম্পে গুলির ঘটনা ও হতাহতের খবর এসেছে। ফলে ২০২৬ সালেও অস্ত্রের ব্যবহার যে পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, সেটি স্পষ্ট।
ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অপহরণ। মাদক পাচার, মানবপাচার, মুক্তিপণ আদায় ও সীমান্ত পারাপারের সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর যোগাযোগ রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় অপহৃত ব্যক্তিদের আটকে রাখা এবং পরে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। এ কারণে ক্যাম্পের অস্ত্রের প্রশ্নটি শুধু রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক পাচার, মানবপাচার, স্থানীয় অপরাধী নেটওয়ার্ক এবং মিয়ানমারের যুদ্ধের প্রভাব।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে ২০২৪ সালের শেষ দিকে। বড় কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে অনানুষ্ঠানিক সমঝোতার পর ২০২৫ সালে হত্যাকাণ্ড ও গুরুতর হামলা কমে আসে। ইউএনএইচসিআরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৯০৯টি হত্যা ও গুরুতর হামলার ঘটনা ২০২৫ সালে কমে ৬৪২ হয়েছে। কিন্তু এই পতনকে স্থায়ী শান্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ একই প্রতিবেদনে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে এখনও ভঙ্গুর বলা হয়েছে।

বরং প্রশ্ন হচ্ছে—সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কি সংঘর্ষের কৌশল বদলেছে? ক্যাম্পে আগের মতো প্রকাশ্য গোলাগুলি কমে গিয়ে যদি টার্গেটেড কিলিং, অপহরণ, মাদক নিয়ন্ত্রণ ও গোপন অস্ত্র মজুত বাড়ে, তাহলে শুধু হত্যার পরিসংখ্যান দিয়ে পরিস্থিতির প্রকৃত অবস্থা বোঝা যাবে না। এই বাস্তবতায় ২০২৬ সালে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অস্ত্র সংকটকে অন্তত চারটি স্তরে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, সীমান্তপথে বিদেশি অস্ত্র প্রবেশ। মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, সীমান্তে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি এবং নাফ নদী ও পাহাড়ি এলাকার ভৌগোলিক বাস্তবতা এই ঝুঁকি বাড়িয়েছে। দ্বিতীয়ত, ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড়ে দেশীয় অস্ত্র উৎপাদন। কয়েক বছরের অভিযানে অস্ত্র তৈরির কারখানা ধরা পড়ায় বোঝা যায়, সরবরাহের একটি অংশ স্থানীয়ভাবেই তৈরি হচ্ছে। তৃতীয়ত, অস্ত্র ও মাদকের একই অপরাধী নেটওয়ার্ক। মাদক পাচারকারীদের নিরাপত্তা, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও আধিপত্য বিস্তারের জন্য অস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ বিভিন্ন অভিযানে এসেছে। চতুর্থত, সশস্ত্র সংগঠনগুলোর পারস্পরিক প্রতিযোগিতা। ARSA, RSO, ARA এবং আরও ছোট গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে প্রভাব বিস্তারের লড়াই ক্যাম্পের নিরাপত্তাকে আরও জটিল করেছে। ২০২৫ সালের একটি বিশ্লেষণে আরসা ও আরএসও-র পাশাপাশি এআরএ Rohingya Islamic Mahaz এবং আরও কিছু ছোট গোষ্ঠীর সক্রিয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এখানে সবচেয়ে বড় সতর্কতার জায়গা হলো—প্রায় সব ঘটনাতেই গোষ্ঠীর নাম উঠে এলেও প্রত্যেক হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে আদালত বা পূর্ণাঙ্গ তদন্তে দায় প্রমাণিত হয়েছে, এমন নয়। ফলে কোনো গোষ্ঠীর নামকে অপরাধের সঙ্গে সরাসরি চূড়ান্তভাবে যুক্ত করার আগে মামলা, চার্জশিট, তদন্ত ও আদালতের নথি যাচাই করা জরুরি।
সাত বছরের ঘটনাপ্রবাহে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি শুধু ‘কত অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে’ নয়; বরং অস্ত্রগুলো কোথা থেকে আসে, কারা অর্থ জোগায়, কারা বহন করে, কোথায় মজুত থাকে, কারা তৈরি করে এবং হত্যাকাণ্ডের পর অস্ত্রগুলো কোথায় চলে যায়—এই পুরো সরবরাহশৃঙ্খল চিহ্নিত করা।
২০২০ সালে যে প্রশ্নটি উঠেছিল—‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এত অস্ত্র এল কোথা থেকে?’—২০২৬ সালেও তার সম্পূর্ণ উত্তর পাওয়া যায়নি। বরং গত ছয় বছরে ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, অস্ত্রের উৎস একক নয়। সীমান্তপথ, মাদক চোরাচালান, স্থানীয় অস্ত্র কারখানা, পাহাড়ি আস্তানা এবং সংগঠিত অপরাধী নেটওয়ার্ক—সব মিলিয়ে একটি বহুমুখী সরবরাহব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।
এই নেটওয়ার্ক ভাঙতে হলে শুধু ক্যাম্পে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করলেই হবে না। প্রয়োজন অস্ত্রের উৎস থেকে ক্যাম্প পর্যন্ত পুরো সরবরাহচক্রের আর্থিক ও যোগাযোগ কাঠামো শনাক্ত করা, সীমান্তপথে নজরদারি বাড়ানো, ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড়ে অস্ত্র কারখানা বন্ধ করা, মাদক ও অস্ত্রের অর্থনৈতিক যোগসূত্র ভেঙে দেওয়া এবং একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা। কারণ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্ত্রের উপস্থিতি এখন আর কেবল ক্যাম্পের ভেতরের নিরাপত্তা সমস্যা নয়। এটি কক্সবাজারের স্থানীয় জনপদ, বাংলাদেশ–মিয়ানমার সীমান্ত এবং বৃহত্তর জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে। আর এই বাস্তবতা যত দীর্ঘ হবে, ততই কঠিন হবে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করা।