সারের বাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতা আপাতত কয়েকটি জেলার স্থানীয় সমস্যা বলে মনে হলেও এর পেছনে থাকা সরবরাহ ও বণ্টনব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে বড় কৃষি সংকটের ঝুঁকি তৈরি করছে কি না, সেই প্রশ্ন এখন গুরুত্ব পাচ্ছে। কৃষকের অভিযোগ—সময়মতো সার মিলছে না, কোথাও সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের বক্তব্য, দেশে প্রকৃত সারসংকট নেই; মূল সমস্যা কিছু এলাকায় সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থার অনিয়ম।
তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান মঙ্গলবার বলেছেন, দেশে সারের কোনো প্রকৃত ঘাটতি নেই। তবে কিছু এলাকায় ডিলারদের সময়মতো বরাদ্দের সার উত্তোলন না করা, নতুন বিতরণব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের সমস্যা এবং স্থানীয় পর্যায়ে অনিয়মের কারণে সংকটের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ১৩ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন সার মজুত রয়েছে।
এই মজুতের মধ্যে ইউরিয়া ৪ লাখ ৮২ হাজার টন, টিএসপি ৩ লাখ ৬৯ হাজার টন, ডিএপি ৩ লাখ ৬৮ হাজার টন এবং এমওপি ১ লাখ ৪৬ হাজার টন। পাশাপাশি আমদানি প্রক্রিয়ায় রয়েছে আরও ৮ লাখ ৬৫ হাজার টনের বেশি সার। এর মধ্যে টিএসপি ২ লাখ ১০ হাজার, ডিএপি ২ লাখ ৮০ হাজার এবং এমওপি ৩ লাখ ৭৫ হাজার টন।
সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে আমদানির অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। ২৪ আগস্ট সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটির বৈঠকে ৩ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়। এর আগে কানাডা, রাশিয়া ও সৌদি আরব থেকে আরও ১ লাখ ১৫ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ শুধু এই দুই ধাপেই ৪ লাখ ৮০ হাজার টন সার আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের এই হিসাব অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পুরোপুরি দেয় না—গুদামে সার থাকা এবং কৃষকের হাতে সময়মতো সার পৌঁছানো কি একই বিষয়?
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বলছে, অন্তত কিছু এলাকায় এই দুইয়ের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে।
গত ২৩ আগস্ট কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে দুই শতাধিক কৃষক কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও সার না পেয়ে এক ডিলারের গুদাম ভেঙে প্রায় ১০ হাজার কেজি ইউরিয়া নিয়ে যান। ওই ডিলারের জন্য ১ হাজার ৩২০ বস্তা সার বরাদ্দ থাকার কথা থাকলেও গুদামে পাওয়া যায় মাত্র ৩৪০ বস্তা। এর আগে ১০ আগস্ট লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে মহাসড়ক অবরোধ করে কৃষকেরা অভিযোগ করেছিলেন, সরকার নির্ধারিত দামের প্রায় দ্বিগুণে তাঁদের টিএসপি, ডিএপি ও ইউরিয়া কিনতে হচ্ছে।
বগুড়াতেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ৩৫০ টাকা নির্ধারিত দামের টিএসপি ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত এবং ১ হাজার ৫০ টাকা দামের ডিএপি ১ হাজার ৬০০ টাকা বা তার বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। দুপচাঁচিয়ার এক কৃষকের বক্তব্য ছিল, বাড়তি টাকা দিলে সার পাওয়া যাচ্ছে, না দিলে পাওয়া যাচ্ছে না।
অর্থাৎ সরকারের জাতীয় মজুতের হিসাবের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কৃষকের অভিজ্ঞতার যে পার্থক্য, সেটিই বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সায়লা খন্দকারের ব্যাখ্যাটি এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও কোনো নির্দিষ্ট উপজেলা বা ইউনিয়নে প্রকৃত চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম হলে সেখানে কার্যত সারসংকট তৈরি হতে পারে। কৃষকের কাছে জাতীয় গুদামে কত টন সার আছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাঁর জমির কাছাকাছি বিক্রয়কেন্দ্রে প্রয়োজনের সময় সার পাওয়া যাচ্ছে কি না।
এই ব্যবধান যদি কেবল প্রশাসনিক সমন্বয়ের সমস্যা হয়, তাহলে তা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু যদি এর সঙ্গে মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট, ডিলারদের অনিয়ম কিংবা বরাদ্দ ব্যবস্থার কাঠামোগত ত্রুটি যুক্ত থাকে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
বর্তমান অস্থিরতার আরেকটি কারণ ডিএপি সারের বাড়তি চাহিদা। নওগাঁর ডিলারদের বক্তব্য অনুযায়ী, ডিএপিতে নাইট্রোজেন থাকায় এবং ইউরিয়ার তুলনায় দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় কৃষকদের একটি অংশ ইউরিয়ার পরিবর্তে ডিএপির দিকে ঝুঁকছেন। ফলে যে পরিমাণ ডিএপি স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ করা হয়েছে, বাস্তবে তার চেয়ে বেশি চাহিদা তৈরি হচ্ছে।
তবে সমস্যাটি আমন মৌসুমে সীমাবদ্ধ নয়। বরং বড় পরীক্ষা সামনে—বোরো ও রবি মৌসুম।
নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে দেশে সারের চাহিদা দ্রুত বেড়ে যায়। কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, মোট সারের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ এই সময় ব্যবহৃত হয়। ফলে আমন মৌসুমে যে সমস্যাগুলো স্থানীয় ও বিচ্ছিন্ন বলে মনে হচ্ছে, একই সরবরাহব্যবস্থা যদি বোরো মৌসুমের কয়েক গুণ বেশি চাহিদার মুখোমুখি হয়, তখন পরিস্থিতি জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এখানে বাংলাদেশের আরেকটি কাঠামোগত দুর্বলতা হলো আমদানিনির্ভরতা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৬৬ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে দেশের সাতটি সরকারি সার কারখানায় উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১১ দশমিক ০৬ লাখ টন। গ্যাসসংকট, পুরোনো যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের সীমাবদ্ধতার কারণে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরেই চাহিদার তুলনায় কম। ফলে মোট চাহিদার ৭০ শতাংশের বেশি সার আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হচ্ছে।
এতে বাংলাদেশের সারব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা এই ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করেছে।
তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা শুধু জ্বালানি পরিবহনকে প্রভাবিত করে না; বৈশ্বিক সার পরিবহন এবং সার উৎপাদনের কাঁচামাল সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশও মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক এই রুটের সঙ্গে যুক্ত। ফলে সেখানে দীর্ঘস্থায়ী সংকট হলে আন্তর্জাতিক সার সরবরাহেও চাপ তৈরি হতে পারে।
এ কারণেই সরকার আগাম সার আমদানি ও মজুত বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপ ইতিবাচক হলেও এর সাফল্য নির্ভর করবে আমদানি করা সার কত দ্রুত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছায় এবং প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতে কীভাবে তা বরাদ্দ করা হয় তার ওপর।
কারণ বর্তমান সংকটের বড় শিক্ষা হলো—শুধু জাতীয় মজুত বাড়ানো যথেষ্ট নয়, সরবরাহব্যবস্থাকেও সক্ষম করতে হবে।
তথ্য উপদেষ্টার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার ইতোমধ্যে বিতরণব্যবস্থার অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। কোথাও দায়িত্ব পালনে সমস্যা পাওয়া গেলে কৃষি বিভাগ বা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বদলি করা হচ্ছে। ডিলারদেরও বরাদ্দের সার সময়মতো উত্তোলন ও বিতরণের বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
এ ধরনের নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ। তবে আরও কার্যকর হবে যদি প্রতিটি জেলা ও উপজেলার জন্য বরাদ্দ, উত্তোলন, মজুত ও বিক্রির তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হয়। এতে জাতীয় পর্যায়ে মজুতের পরিসংখ্যানের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে প্রকৃত সরবরাহ পরিস্থিতিও স্পষ্ট হবে।
সারের বাজারে বর্তমান অস্থিরতাকে তাই এখনই বড় কৃষিবিপর্যয়ের শুরু বলা যাবে না। সরকারের হাতে উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে, নতুন করে আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং বোরো মৌসুমের জন্য প্রস্তুতির কথাও বলা হচ্ছে।
কিন্তু একই সঙ্গে কৃষকের হাতে সময়মতো সার না পৌঁছানো, অতিরিক্ত দামের অভিযোগ, ডিলারদের বরাদ্দ ও উত্তোলনে অসামঞ্জস্য এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের দুর্বলতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
শেষ পর্যন্ত সারের প্রকৃত সংকট পরিমাপের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূচক হবে গুদামের হিসাব নয়—কৃষক তাঁর জমির জন্য প্রয়োজনীয় সার নির্ধারিত দামে, নির্ধারিত সময়ে পাচ্ছেন কি না।
আমন মৌসুম কোনোভাবে সামলে নেওয়া গেলেও আসল পরীক্ষা হবে আগামী বোরো মৌসুমে। তখন যদি জাতীয় মজুত, আমদানি, স্থানীয় বরাদ্দ ও মাঠপর্যায়ের সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় করা যায়, বর্তমান অস্থিরতা সাময়িক সমস্যা হিসেবেই থেকে যাবে। কিন্তু সেই সমন্বয় ব্যর্থ হলে আজকের স্থানীয় সারসংকটই আগামী দিনে উৎপাদন খরচ, খাদ্যের দাম এবং খাদ্যনিরাপত্তার ওপর বড় চাপ তৈরি করতে পারে।