মাগুরার আলোচিত আট বছরের শিশু আছিয়া হত্যা ও ধর্ষণ মামলায় আসামি হিটু শেখকে বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। সোমবার আসামির আপিল ও রাষ্ট্রপক্ষের করা ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি করে এ রায় ঘোষণা করেন উচ্চ আদালত।
সোমবার (৩১ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।
এর আগে গত ২৪ আগস্ট এ মামলায় হিটু শেখের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি শেষ হয়। পরে ২৫ আগস্ট রায়ের জন্য ৩১ আগস্ট দিন ধার্য করেন আদালত।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, গত ৬ মার্চ মাগুরা সদর উপজেলার নিজনান্দুয়ালী গ্রামে বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল শিশু আছিয়া। সেখানে তার বোনের শ্বশুর হিটু শেখ শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার চেষ্টা করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।
গুরুতর আহত অবস্থায় আছিয়াকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ মার্চ মারা যায় শিশুটি।
এ ঘটনায় আছিয়ার মা আয়েশা আক্তার বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। শিশুটির ওপর নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মাগুরাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ ও আন্দোলন কর্মসূচি পালিত হয়।
পরে বিচারিক আদালতে মামলার বিচার শেষে হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন আসামি। একই সঙ্গে বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য রাষ্ট্রপক্ষ ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠায়।
দুই পক্ষের শুনানি শেষে সোমবার হাইকোর্ট হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখলেন। এর ফলে বিচারিক আদালতের দেওয়া সর্বোচ্চ শাস্তিই বহাল থাকল।
রায় ঘোষণার পর স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে এক প্রতিক্রিয়ায় আছিয়ার মা আয়েশা আক্তার বলেন, আজকে ফাঁসির রায় ঘোষণা করেছে। যতক্ষণ পর্যন্ত হিটু শেখের ফাঁসি কার্যকর না হবে, ততক্ষণ আমার মনে কোনো শান্তি নেই। যখন হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে শুনতে পাব, তখন আমি খুশি হব এবং গোটা এলাকাবাসীও খুশি হবে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার মনি (আছিয়া) কোনো অপরাধ করেনি। যে কষ্ট নিয়ে দুনিয়া থেকে চলে গেছে, সেই কষ্ট কোনো মা যেন না পায়। আমার মনিকে বাঁচানোর জন্য সরকার অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু ওর বাঁচার ক্ষমতা ছিল না।’
বিজ্ঞাপন
হিটু শেখের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে আয়েশা আক্তার বলেন, ‘এমনভাবে হিটুর ফাঁসি দেওয়া হোক, যাতে গোটা পৃথিবীর মানুষ বুঝতে পারে যে সরকার এখনো বিচার করতে পারে। যখন আমি শুনতে পাব ওর ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে, তখন আমি খুশি হব।’
তিনি দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘আমি চাই দ্রুত রায় কার্যকর করা হোক। আমার পরিবার অসহায়। সরকারের কাছে আমার চাওয়া, আমার পরিবারকে সহযোগিতা করা হোক।’
এ সময় নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেন আছিয়ার মা। তিনি বলেন, ‘আমি তো আতঙ্কের মধ্যে রয়েছি। ফাঁসির রায় আবার ঘোষণা করা হয়েছে। হিটু শেখের ছেলেরা যদি আবার আমার পরিবারের ক্ষতি করে—এজন্য সরকারের সহযোগিতা চাই। প্রশাসন যাতে তাদের নজরে রাখে, যাতে আমার পরিবারের কোনো ক্ষতি করতে না পারে।’
বিজ্ঞাপন
আদালতে আসামিপক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে ছিলেন হাফিজুর রহমান খান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ইমাম হোসেন তারেক।
রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এর আগে গত ২৫ আগস্ট বহুল আলোচিত এ মামলায় আসামি হিটু শেখের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর রায়ের দিন পিছিয়ে ৩১ আগস্ট ধার্য করা হয়। এর আগে গত ২৪ আগস্ট হিটু শেখের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি শেষ হয়। মামলার নথি অনুযায়ী, রমজানের ছুটিতে শহরের নিজনান্দুয়ালী এলাকায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে গত বছরের ৫ মার্চ রাতে ধর্ষণের শিকার হয় আট বছরের শিশু আছিয়া। তার বোনের শ্বশুর হিটু শেখ শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যার চেষ্টা করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।
গুরুতর অবস্থায় শিশুটিকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়। পরে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আছিয়ার মা বাদী হয়ে হিটু শেখসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে পুলিশ মামলার সব আসামিকে গ্রেপ্তার করে।
২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল মামলাটির অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। একই বছরের ২৩ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয়। ২৭ এপ্রিল থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়ে রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়। গত বছরের ৭ মে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। মাত্র ১৩ কার্যদিবসে শেষ হয় আলোচিত এ মামলার বিচারিক কার্যক্রম।
গত বছরের ১৩ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এম জাহিদ হাসানের আদালতে মামলার শেষ দিনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। যুক্তিতর্ক শেষে একই বছরের ১৭ মে রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি হিটু শেখকে (৪৭) মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তবে মামলার বাকি তিন আসামিকে খালাস দেওয়া হয়। খালাসপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন নিহত শিশুর বোনের স্বামী সজীব শেখ (১৯), সজীব শেখের ছোট ভাই (১৭) ও সজীবের মা জাহেদা বেগম (৪০)।
ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, কোনো মামলায় বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলে তা অনুমোদনের জন্য মামলার যাবতীয় নথি উচ্চ আদালতে পাঠাতে হয়। সে অনুযায়ী গত বছরের ২১ মে এ মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। পরে যাচাই-বাছাই শেষে মামলার পেপারবুক তৈরির জন্য নথি বিজি প্রেসে পাঠানো হয়। পেপারবুক প্রস্তুত হওয়ার পর গত ৮ জুন তা হাইকোর্টে পাঠানো হয়। এরপর মামলাটি শুনানির জন্য বিশেষায়িত বেঞ্চের কার্যতালিকায় আসে।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে সোমবার হাইকোর্ট হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। রায়ের পর দ্রুত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন আছিয়ার মা আয়েশা আক্তার। পাশাপাশি নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।