নেপালে ভয়াবহ বন্যায় একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত ও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারতীয় সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। গত ২৬ আগস্ট ভোতেকোশি নদীতে আকস্মিক বন্যার পর থেকে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য অনুমোদিত দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে। ফলে বর্ষা মৌসুমে নেপালের বিদ্যুৎ উদ্বৃত্তের সুবিধা থেকে আপাতত বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশ।
দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের বুধবারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্প দুটি হলো ২২ দশমিক ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং ২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। এই দুটি কেন্দ্র থেকেই বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছিল।
নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির (এনইএ) ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠ বলেন, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী দুটি প্রকল্পই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই বিকল্প কোনো প্রকল্প থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ পাঠানোর অনুমতি দিতে ভারতের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, বর্তমানে বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
২০২৪ সালের ৫ জানুয়ারি নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানির জন্য এনইএ, ভারতের এনটিপিসি বিদ্যুৎ ব্যাপার নিগম লিমিটেড (এনভিভিএন) এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়। সেই চুক্তির আওতায় প্রতি বছর ১৫ জুন থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত নেপাল থেকে বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। ভারতীয় সঞ্চালন অবকাঠামো ব্যবহার করে এই বিদ্যুৎ বাংলাদেশে পৌঁছায়।
গত বছর ২৭ নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-নেপাল যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির (জেএসসি) বৈঠকে বিদ্যমান ৪০ মেগাওয়াটের সঙ্গে আরও ২০ মেগাওয়াট যোগ করে মোট ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির বিষয়ে দুই দেশ নীতিগতভাবে সম্মত হয়। তবে ভারতের সঞ্চালনব্যবস্থা ব্যবহার করে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বাংলাদেশে পাঠানোর অনুমোদন এখনো দেয়নি নয়াদিল্লি।
দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ভারতে ২১ দশমিক ৪ মেগাওয়াট এবং ত্রিশূলী প্রকল্প থেকে ১৮ দশমিক ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিক্রির অনুমোদন ছিল। ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্যও প্রকল্প দুটিকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। ফলে এই দুটি কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি নেপালের রপ্তানি আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সাধারণত বর্ষা মৌসুম নেপালের জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে অনুকূল সময়। পাহাড়ি নদীগুলোতে পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় এ সময়ে দেশটি বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। গত কয়েক বছরে বর্ষায় নেপাল গড়ে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করেছে। আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার পরিকল্পনাও ছিল দেশটির।
কিন্তু এবার অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা সেই বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাকেই বড় ধাক্কা দিয়েছে। বন্যার পর নেপালের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে প্রায় ৬৫০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। দেশটির মোট ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি আয়ের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে। দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নেপাল বাংলাদেশ ও ভারতের কাছে মোট ২ হাজার ৯৩২ কোটি নেপালি রুপির বিদ্যুৎ রপ্তানি করেছে। একই সময়ে শুষ্ক মৌসুমে ভারত থেকে ১ হাজার ২৩ কোটি রুপির বিদ্যুৎ আমদানি করলেও নিট বিদ্যুৎ বাণিজ্যে নেপালের উদ্বৃত্ত ছিল ১ হাজার ৯০৯ কোটি রুপি।
এনইএ এখন ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন অবকাঠামো পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। পাশাপাশি সচল অন্য জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ পাঠানোর অনুমোদনের জন্য ভারতের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। বিকল্প কোনো প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুমতি মিললে বাংলাদেশে রপ্তানি আবার শুরু হতে পারে।
ভয়াবহ বন্যার প্রভাব অবশ্য শুধু বিদ্যুৎ খাতেই সীমাবদ্ধ নেই। নেপালের তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে ২৬ আগস্টের বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ২৫০ জনে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে। এখনো ৪ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুর্যোগের দিন সকালে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছাকাছি রাসুয়া জেলার তিমুর ও স্যাফ্রুবেশি এলাকায় ভোতেকোশি নদীতে আকস্মিক ও প্রবল স্রোতের সৃষ্টি হয়। পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে নদীতীরবর্তী জনপদ ও অবকাঠামো ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক, সেতু, ভবন ও বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। পরে বন্যার স্রোত ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে পড়ে।
প্রবল স্রোতে মানুষ, যানবাহন ও বিভিন্ন স্থাপনা ভেসে যায়। ভাটির বিভিন্ন এলাকায় মরদেহ ও মানবদেহের অংশও পৌঁছেছে। উদ্ধারকাজের পাশাপাশি এখন ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ অবকাঠামো পুনর্গঠন নেপালের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি বন্ধ হওয়া দুই দেশের বিদ্যুৎ সহযোগিতার জন্যও একটি সাময়িক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিকল্প প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুমতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত কেন্দ্রগুলোর দ্রুত পুনরুদ্ধারের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি কবে আবার স্বাভাবিক হবে।