গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চর পূর্ব লালচামার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষক ২৭ মাস বা ৮১১ দিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকেও সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি জানা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ওই অর্থ উত্তোলনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষক কামরুন্নাহার বেগম। তিনি ২০২৩ সালের ৯ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘ সময় বিনা ছুটিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও করা হয়।
সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট কামরুন্নাহার বেগমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৪-এর উপবিধি (২)-এর (১)(ক) অনুযায়ী তাঁকে তিরস্কার লঘুদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার সময় ২০২৩ সালের ৯ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিনা বেতনে অসাধারণ ছুটি হিসেবে মঞ্জুর করা হয়।
এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার লক্ষণ কুমার দাশের সই করা অফিস আদেশ জারি করা হয়। ওই আদেশের পর কামরুন্নাহার বেগম ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ে যোগদান করেন।
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর দিক হলো, বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকার সময়ের বেতন-ভাতার একটি বড় অংশ পরবর্তী সময়ে উত্তোলন করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাস এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ মাস—মোট ১৮ মাসের বেতন-ভাতার অর্থ ২০২৬ সালের মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে উত্তোলন করা হয়।
সোনালী ব্যাংক পিএলসি, সুন্দরগঞ্জ শাখায় কামরুন্নাহার বেগমের হিসাব থেকে ওই অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অনুপস্থিতির সময় যেহেতু তাঁকে বিনা বেতনে অসাধারণ ছুটি দেওয়া হয়েছিল, সে সময়ের বেতন-ভাতা কীভাবে তাঁর হিসাবে জমা হলো এবং পরে কীভাবে তা উত্তোলন করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ ঘটনায় সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নুর মোহাম্মদ এবং উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার মুকুল চন্দ্র রায়ের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া এত দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা একজন শিক্ষকের হিসাবে বেতন-ভাতার অর্থ জমা ও উত্তোলনের বিষয়টি ঘটার কথা নয়।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নুর মোহাম্মদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে কল কেটে দেন। উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার মুকুল চন্দ্র রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার লক্ষণ কুমার দাশ বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। সাংবাদিকদের মাধ্যমে তিনি বিষয়টি জানতে পেরেছেন। তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
চর পূর্ব লালচামার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু সামউদ্দিন আনছারী বলেন, দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকার পর ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর কামরুন্নাহার বেগম বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাঁকে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিনা বেতনে অসাধারণ ছুটি মঞ্জুর করে কাজে যোগদানের সুযোগ দিয়েছে। প্রধান শিক্ষক বলেন, অনুপস্থিত সময়ের বেতন-ভাতা তিনি উত্তোলন করেছেন কি না, তা তাঁর জানা নেই। তবে ওই শিক্ষককে অনুপস্থিত দেখিয়েই তিনি মাসিক রিটার্ন দাখিল করেছেন।
দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার পরও একজন সরকারি কর্মচারীর হিসাবে কীভাবে ওই সময়ের বেতন-ভাতার অর্থ জমা হলো এবং তা কীভাবে উত্তোলন করা হলো—এ নিয়ে এখন তদন্তের দাবি উঠেছে। স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, বিষয়টি শুধু ওই শিক্ষকের বেতন উত্তোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; সরকারি অর্থ ছাড়ের পুরো প্রক্রিয়ায় কারা জড়িত ছিলেন, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তাঁদের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করে সরকারি অর্থ ফেরত নেওয়ার পাশাপাশি অনিয়মের সঙ্গে জড়িত শিক্ষক বা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।