রেলপথে কয়লা পরিবহনে সংকটের কারণে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়েছে ভারতের আদানি পাওয়ারের ঝাড়খন্ডের গড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র। রেলপথে অতিরিক্ত চাপ, তীব্র যানজট এবং পরিবহন নেটওয়ার্কে বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে প্রয়োজনের তুলনায় কম কয়লা পৌঁছাচ্ছে কেন্দ্রটিতে। ফলে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের সময়সূচি সমন্বয় করছে প্রতিষ্ঠানটি। দিনের অপেক্ষাকৃত কম চাহিদার সময়ে সরবরাহ কমিয়ে সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বুধবার বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) দেওয়া এক বিবৃতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেছে আদানি পাওয়ার। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, কয়লা পরিবহনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ভারতীয় রেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে তারা। দ্রুত কয়লা সরবরাহ বাড়ানো গেলে গড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহও স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরবে বলে আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
আদানির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রেলপথে তীব্র যানজট এবং পরিবহন নেটওয়ার্কে একাধিক বিধিনিষেধের কারণে কয়লা বহনকারী রেকের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে গড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রে স্বাভাবিকের তুলনায় কম কয়লা পৌঁছাচ্ছে। কয়লার সরবরাহ কমে যাওয়ায় কেন্দ্রটির উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় সাময়িক পরিবর্তন আনতে হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকার সময়ে উৎপাদন ও সরবরাহ কিছুটা কমানো হচ্ছে। অন্যদিকে সন্ধ্যায় বিদ্যুতের চাহিদা যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে, তখন পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে উৎপাদন ও সরবরাহের সময়সূচি পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কয়লা সংকটের কারণে মোট বিদ্যুৎ সরবরাহে প্রভাব যতটা সম্ভব কমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে পিডিবিকে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে আদানি পাওয়ার। একই সঙ্গে গড্ডা কেন্দ্রে স্বাভাবিক হারে কয়লা সরবরাহ নিশ্চিত করতে ভারতীয় রেলের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে। কয়লা বহনকারী রেকের চলাচল বাড়াতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদানির গড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চুক্তি অনুযায়ী কেন্দ্রটি থেকে বাংলাদেশে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা। কিন্তু কয়লা সরবরাহে সাম্প্রতিক সংকটের কারণে সেই পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না।
জাতীয় সংসদে বুধবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে গড্ডা কেন্দ্র থেকে দিনে প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় প্রায় ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ চুক্তিতে উল্লেখ করা সক্ষমতার তুলনায় সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এর মধ্যেই আদানি পাওয়ারের পক্ষ থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে কয়লা পরিবহনে রেলসংকটের কথা জানানো হলো।
শুধু গড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রই নয়, অতিবৃষ্টির কারণে ভারতের পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলের কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও কয়লা মজুতের সমস্যায় পড়েছে। অতিবৃষ্টিতে খনি, সড়ক ও রেলপথের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় কয়লা উত্তোলন ও পরিবহনে সমস্যা তৈরি হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লা সরবরাহের সংকটকে শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমস্যা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। দেশের অন্যতম বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পায়রা এবং মাতারবাড়ীর একটি করে ইউনিট বর্তমানে বন্ধ অথবা সীমিত সক্ষমতায় চলছে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। গরমের সময়ে চাহিদা বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিভিন্ন উৎসে সীমাবদ্ধতার মধ্যে আদানি কেন্দ্রের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর গুরুত্ব গত কয়েক বছরে বেড়েছে। বড় কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র কয়লার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও উৎপাদনে তার প্রভাব পড়তে পারে। আবার এসব কেন্দ্রের কোনো একটি ইউনিট বন্ধ থাকলে ঘাটতি পূরণ করতে গ্যাস, তেল বা অন্যান্য উৎস থেকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন হয়। এতে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে।
এদিকে সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় কম হতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। বৃষ্টিপাত কমে গেলে রেলপথে কয়লা পরিবহনের বর্তমান সংকটও ধীরে ধীরে কমবে বলে আশা করছে আদানি পাওয়ার। প্রতিষ্ঠানটির প্রত্যাশা, কয়লা পরিবহন স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরলে গড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে এবং বাংলাদেশেও চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ ফিরিয়ে আনা যাবে।
তবে কয়লা পরিবহন স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে এবং বাংলাদেশে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কবে নাগাদ ফিরবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানায়নি আদানি পাওয়ার। ফলে সাময়িক এই সংকট কতটা দীর্ঘায়িত হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, একটি নির্দিষ্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। গড্ডা কেন্দ্রের মতো বড় একটি উৎস থেকে সরবরাহ কমে গেলে একই সময়ে দেশের অন্য কয়েকটি কেন্দ্রেও উৎপাদন কম থাকলে ঘাটতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন এবং বিকল্প উৎস প্রস্তুত রাখাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
এখন ভারতের রেলপথে কয়লা পরিবহন পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হয় এবং গড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লার মজুত ও সরবরাহ কতটা বাড়ানো যায়, তার ওপরই বাংলাদেশে আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎ সরবরাহের পরবর্তী পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করছে। আপাতত চাহিদার সময় অনুযায়ী উৎপাদন ও সরবরাহ সমন্বয় করেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি।