আন্তর্জাতিক

নেপালে বিপর্যয়, জীবিত উদ্ধারের আশা ফিকে হচ্ছে

আজাদ ডেস্ক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৯
 ছবি:

হিমালয়ের কোলঘেঁষা উপত্যকায় আকস্মিক বন্যার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। কোথাও ধ্বংসস্তূপ, কোথাও কাদায় চাপা পড়া জনপদ, আবার কোথাও নিখোঁজ স্বজনের সন্ধানে মরিয়া মানুষ। সময় যত গড়াচ্ছে, জীবিত কাউকে উদ্ধারের সম্ভাবনা ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে। তবু আশা ছাড়ছেন না স্বজন ও উদ্ধারকারীরা। বিশেষ করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ভূগর্ভস্থ টানেলে আটকে পড়া শ্রমিকদের জীবিত উদ্ধারের জন্য এখনো চলছে জোরালো অভিযান।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৬ আগস্ট সকালে নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর প্রাণহানি এক হাজার ১০০ ছাড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত সাড়ে চার হাজার মানুষ। বিপর্যয়ের পর এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও অনেক দুর্গম এলাকায় এখনো উদ্ধারকাজ পুরোপুরি চালানো সম্ভব হয়নি।

নেপালের জাতীয় জরুরি পরিচালনা কেন্দ্রের (এনইওসি) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ফণীন্দ্র পাউডেল বলেন, জীবিত কাউকে পাওয়ার আশা দিন দিন কমে আসছে। তবে উদ্ধারকারী দল এখনো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, আশা ফিকে হলেও তা পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে না।

উদ্ধার অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র এখন জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ভূগর্ভস্থ টানেল। নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের (এনইএ) পরিচালনা পর্ষদের সদস্য আমশু কিরণ শাহি জানিয়েছেন, কয়েকটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় শ্রমিকেরা আটকা পড়ে থাকতে পারেন। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাওয়ার হাউসে সাধারণত সুরক্ষিত কক্ষ থাকে। সেখানে কয়েক দিন টিকে থাকার মতো খাবার ও পানি মজুত রাখার ব্যবস্থাও রয়েছে। এ কারণে অন্তত চারটি প্রকল্পের টানেলে আটকে পড়া শ্রমিকেরা এখনো জীবিত থাকতে পারেন বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।

এর মধ্যে ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে উদ্ধারকাজ বিশেষভাবে জটিল হয়ে উঠেছে। ভেতরে আটকে থাকা শ্রমিকদের কাছে পাইপের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে। টানেলের অপেক্ষাকৃত শুষ্ক ও নিরাপদ অংশে শ্রমিকেরা আশ্রয় নিয়ে থাকলে তাঁদের বাঁচিয়ে বের করে আনার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন উদ্ধারকারীরা।

দুর্যোগের মাত্রা ও দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে নেপালের একার পক্ষে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষায়িত প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ধারকারী দলও কাজে যুক্ত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ সরানো, ভূগর্ভে জীবিত মানুষের অবস্থান শনাক্ত করা এবং দুর্গম এলাকায় উদ্ধার সরঞ্জাম পৌঁছে দিতে ব্যবহার করা হচ্ছে ভারী যন্ত্রপাতি ও আধুনিক প্রযুক্তি।

সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বত অংশেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। সেখানে এখন পর্যন্ত ১৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। দুর্যোগের পর নেপালের সঙ্গে যোগাযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ গিরোং সীমান্ত সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছিল। পরে চীন সড়কটি পুরোপুরি চালুর ব্যবস্থা করে। এর ফলে ভারী এক্সক্যাভেটর, ডিজিটাল লাইফ-ডিটেকশন যন্ত্র এবং প্রশিক্ষিত কুকুরের দল দুর্গত এলাকায় পৌঁছানোর সুযোগ পেয়েছে।

নেপালের রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলার বহু জনপদে এখনো ধ্বংসের চিহ্ন। যাঁরা প্রাণে বেঁচেছেন, তাঁদের অনেকেই নিজেদের ঘরবাড়ির ধ্বংসস্তূপে শেষ সম্বলটুকু খুঁজছেন। কারও ঘর নেই, কারও দোকান নেই, আবার অনেক পরিবার হারিয়েছে একাধিক স্বজন।

নুয়াকোটের ৪৫ বছর বয়সী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শান্তা সুনার বলেন, তিনি ও তাঁর স্বামী এক পোশাকে প্রাণ হাতে নিয়ে পালিয়ে বেঁচেছেন। তাঁদের যা কিছু ছিল, সবই ধ্বংস হয়ে গেছে। তারপরও তাঁরা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করছেন, কারণ অন্তত তাঁরা বেঁচে আছেন।

দুর্যোগের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে শিশুদের ওপর। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অনেক শিশুর মধ্যে তীব্র মানসিক চাপ তৈরি করেছে। চোখের সামনে স্কুলবাস পানির স্রোতে ভেসে যাওয়া, বাড়িঘর ধ্বংস হওয়া কিংবা স্বজন ও পরিচিত মানুষকে হারানোর মতো অভিজ্ঞতা শিশুদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

এদিকে নিখোঁজ স্বজনদের ফিরে পাওয়ার অপেক্ষাও অনেক পরিবারের কাছে ধীরে ধীরে নিষ্ঠুর বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। মৃতদেহ না পাওয়া গেলেও হিন্দু রীতি অনুযায়ী নিখোঁজ স্বজনদের প্রতীকী শেষকৃত্য করছেন কেউ কেউ। রাসুয়া ও কাঠমান্ডুতে খড় দিয়ে মানুষের অবয়ব তৈরি করে শেষবিদায় জানানোর ঘটনাও ঘটছে।

কাঠমান্ডুর মর্গের সামনেও স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা। উদ্ধার হওয়া অনেক মরদেহ এতটাই বিকৃত যে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই শত শত স্বজন ডিএনএ নমুনা দিতে অপেক্ষা করছেন। তাঁদের আশা, মরদেহের পরিচয় শনাক্ত হলে অন্তত নিখোঁজ প্রিয়জনের শেষ পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

এই মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন দাবি তুলেছে নেপাল। দেশটির বক্তব্য, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায় তুলনামূলকভাবে কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয় অঞ্চলে একের পর এক ভয়াবহ দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। তাই কেবল জরুরি ত্রাণ বা আর্থিক সহায়তা নয়, ক্ষয়ক্ষতির জন্য জলবায়ু ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ প্রয়োজন।

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খেনাল বলেছেন, এই বিপর্যয়ের পর তাঁর দেশ কারও কাছে কেবল ত্রাণ বা দান চাইতে চায় না। নেপাল জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং ক্ষয়ক্ষতির যথাযথ ক্ষতিপূরণ চায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশগুলোর কাছে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি জানানো হয়েছে।

নেপালের এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে হিমালয়ের দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবেশ। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিমবাহ গলছে, হিমবাহের হ্রদ ও বরফের স্থিতিশীলতা বদলাচ্ছে এবং পাহাড়ি অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে। এবারের বিপর্যয় সেই ঝুঁকির ভয়াবহ মাত্রা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

তবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের কাছে এখন জলবায়ু ন্যায়বিচারের দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনা অপেক্ষা করছে আরও জরুরি প্রশ্ন—নিখোঁজ স্বজনদের কেউ কি এখনো কোথাও বেঁচে আছেন? উদ্ধারকারী দলগুলো সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ধ্বংসস্তূপ, কাদা ও অন্ধকার ভূগর্ভস্থ টানেলে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা কমছে, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কাউকে মৃত ঘোষণা করা না হচ্ছে, ততক্ষণ স্বজনদের আশা পুরোপুরি নিভে যাচ্ছে না।
 

বিষয়:

নেপালে বন্যা নেপাল বিপর্যয় নেপাল বন্যা ২০২৬ নেপালে ভয়াবহ বন্যা নেপাল ভূমিধস হিমালয়ে বন্যা হিমালয় বিপর্যয় নেপাল বন্যায় মৃত্যু নেপালে নিখোঁজ নেপাল উদ্ধার অভিযান নেপালে উদ্ধারকাজ জলবিদ্যুৎ টানেলে শ্রমিক নেপালের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ ভূগর্ভস্থ টানেলে আটকে শ্রমিক জীবিত উদ্ধারের আশা নেপাল চীন সীমান্ত তিব্বতে বন্যা চীনের তিব্বত বন্যা রাসুয়া বন্যা নুয়াকোট বন্যা কাঠমান্ডু নেপাল দুর্যোগ নেপালে জলবায়ু বিপর্যয় জলবায়ু পরিবর্তন জলবায়ু ক্ষতিপূরণ জলবায়ু ন্যায়বিচার নেপালের ক্ষতিপূরণ দাবি ভারত চীন যুক্তরাষ্ট্র হিমবাহ গলে বন্যা হিমালয়ের হিমবাহ জলবায়ু দুর্যোগ সেভ দ্য চিলড্রেন নেপাল সর্বশেষ খবর

মনোহরগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ফার্মেসি থেকে রোগীদের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ দেওয়ার অভিযোগ

প্রয়াস প্রতিবন্ধী স্কুলের উদ্যোগে ১৫ সেপ্টেম্বর শুরু হচ্ছে গ্রামীণ ও কুটির শিল্প মেলা

নওগাঁয় সড়ক পরিবহন আইনের হত্যা মামলায় একজন গ্রেপ্তার

নওগাঁয় আমবাগান থেকে গ্রাম পুলিশের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

২৭ মাস বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত, বেতন-ভাতা উত্তোলনের অভিযোগ শিক্ষকের বিরুদ্ধে

ঘুষের অভিযোগ ও অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিতি: সাত পুলিশ কর্মকর্তা বরখাস্ত

জামায়াতে যোগ দেওয়া বিচারপতি ঘুষের অভিযোগে সন্দেহের কারণে অপসারিত হয়েছিলেন

কয়লা পরিবহনে সংকট, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমালো আদানি

নেপালে বিপর্যয়, জীবিত উদ্ধারের আশা ফিকে হচ্ছে

১০

চাইনিজ পোশাক ব্যবসায়ীর কোটি টাকা নিয়ে উধাও ড্রাইভার, পাঠালেন খুদেবার্তা

১১

বিটিভির লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ, দর্শকের সমালোচনা; প্রশ্ন তুলছেন শিল্পীরাও

১২

দশ সংসদীয় কমিটি গঠন, সভাপতির পদে বিরোধী দল উপেক্ষিত

১৩

নেপালে বন্যার প্রভাবে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি বন্ধ

১৪

বক্তব্য প্রত্যাহারে দুদককে ২৪ ঘণ্টার সময় দিলেন আসিফ

১৫

সাড়ে পাঁচ মাস পর দেশে ফিরলেন মির্জা আব্বাস

ট্রেনের ১৭ হাজার টিকিটের জন্য ২ কোটি ৭৬ লাখ বার চেষ্টা

দিল্লিতে ভারী বৃষ্টিতে বিমান চলাচল বিঘ্ন, ব্যাপক দুর্ভোগ

মিরাজ-সৌম্যকে দলে টানতে চায় রংপুর

আওয়ামী লীগ নেত্রী গ্রেফতার

গাজায় একদিনে নিহত আরও ৭৯ ফিলিস্তিনি

বিএসএফের গুলিতে ২ বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ

মাদককারবারিদের নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ওসির

২ বহিরাগতের নিয়ন্ত্রণে সরকারি অফিস!

নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ ব্যতীত সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতির সুযোগ নেই: আলী রীয়াজ

১০

বনানীতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ২

১১

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে স্থগিত যেসব চাকরির পরীক্ষা

১২

নন-ক্যাডারে ৪১৩৬ জনকে নিয়োগের সুপারিশ

১৩

৬৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএ’র গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

১৪

নারায়ণগঞ্জের আলোর বাতিঘর ‘সুধীজন পাঠাগার’

১৫

মাদ্রাসায় গ্রামীণ ফোন করপোরেট নম্বর ব্যবহার বাধ্যতামূলক

সম্পর্কিত