নিজের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দেওয়া বক্তব্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বক্তব্য প্রত্যাহার করে গণমাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার না করলে দুদকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
বুধবার রাতে রাজধানীর বাংলা মোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন আসিফ মাহমুদ। এর আগে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে কমিশন।
অনুসন্ধানের আওতায় থাকা অন্য তিনজন হলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্মসচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন এবং যুব-১ শাখার উপসচিব মো. মাসুম আহমেদ। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে বদলি, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে দুর্নীতির অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে বলে দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘দুদকের মুখপাত্র যদি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার না করেন এবং গণমাধ্যমে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে পরিষ্কার না করেন, তাহলে আমি আইনি ব্যবস্থা নেব।’
তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘সত্য উদঘাটনের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে আমি প্রস্তুত আছি।’
দুদকের অনুসন্ধানের ভিত্তি হিসেবে যে অভিযোগের কথা বলা হয়েছে, তাতে দাবি করা হয়েছে, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা থাকাকালে আসিফ মাহমুদ বদলি, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম ও দুর্নীতি করেছেন। কয়েকজন কর্মকর্তা ও যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল ও পদায়নের জন্য ৭৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য দেড় কোটি টাকা এবং পদোন্নতির পর পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের জন্য আরও ২ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসিফ মাহমুদ বলেন, ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল এবং পরবর্তী সময়ে ১৫০ জনের পদায়নকে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত করে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেখানে আদালতের রায় বাস্তবায়ন ও নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আদালতের রায়ের কারণে ৩৮ কর্মকর্তার নবম গ্রেডের চলতি দায়িত্ব বাতিল করে তাঁদের দশম গ্রেডের মূল পদে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এরপর ওই ৩৮টি পদসহ বিদ্যমান শূন্য পদে পদোন্নতির বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মতামত চাওয়া হয়।
আসিফ মাহমুদের ভাষ্য, জ্যেষ্ঠতার তালিকা, সার্ভিস রেকর্ড, এসিআর এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনার জন্য পিএসসিতে পাঠানো হয়েছিল। পিএসসি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় মন্ত্রণালয়ের পক্ষে নিজস্বভাবে কাউকে পদোন্নতি দেওয়ার সুযোগ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
দুদকের অনুসন্ধান শুরুর সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে আসিফ মাহমুদ বলেন, বিরোধী দলকে দমনের হাতিয়ার হিসেবে দুদককে আবারও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যেই বিএনপি সরকার দুদকের সংস্কার প্রক্রিয়া বাতিল করেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। ওই সরকারে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের একজন হিসেবে উপদেষ্টা হন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
শুরুতে তিনি শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। পরে ২০২৪ সালের নভেম্বরে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পরিবর্তন করে তাঁকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেন আসিফ মাহমুদ। একই মাসের শেষ দিকে তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দেন। বর্তমানে তিনি দলটির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দুদকের অনুসন্ধান এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট নথি ও ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করা হবে বলে জানিয়েছে কমিশন। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা শেষ পর্যন্ত কীভাবে নির্ধারিত হয়, তা অনুসন্ধান ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।