জাতীয় সংসদে আরও ১০টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে এসব কমিটির কোনো একটির সভাপতির পদেও বিরোধী দলের কাউকে রাখা হয়নি। এ নিয়ে বুধবার সংসদের বৈঠকে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে বিতর্ক হয়। বিরোধী দলীয় উপনেতা সৈয়দ মো. আব্দুল্লাহ মো. তাহের অভিযোগ করেছেন, সংসদে প্রতিনিধিত্বের অনুপাতে কমিটির সদস্যপদ বণ্টন করা হলেও সভাপতির পদ দেওয়ার ক্ষেত্রে সেই নীতি অনুসরণ করা হয়নি। একইভাবে কমিটি গঠন চলতে থাকলে ভবিষ্যতে বিরোধী দল সংসদে না-ও থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
বুধবার দিনের শেষ কার্যসূচিতে কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির প্রস্তাবে একে একে ১০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি গঠন শেষে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বৈঠক মুলতবি ঘোষণা করতে গেলে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ চান আব্দুল্লাহ মো. তাহের। তাহের বলেন, সরকারি দলের সঙ্গে বৈঠকে সংসদে প্রতিনিধিত্বের আনুপাতিক হারে বিরোধী দলকে ২৬ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। কমিটির সদস্যপদ বণ্টনের ক্ষেত্রে সেই সিদ্ধান্ত মানা হলেও সভাপতির পদ দেওয়ার ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। তাঁর দাবি, একপর্যায়ে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বিরোধী দলকে ১০টি সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল এবং এ জন্য বিরোধী দলের কাছ থেকে সভাপতির জন্য সম্ভাব্য সদস্যদের তালিকাও নেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, সভাপতির পদেও আমরা ২৬ শতাংশ পাব। এটা আমাদের অধিকার। সভাপতি কোন দল থেকে কতজন হবেন, সে বিষয়ে কার্যপ্রণালি বিধিতে কোনো অনুপাত নির্ধারণ করা নেই।’
সরকারি দলের এমন আচরণে বিরোধী দলের সংসদে থাকার আগ্রহ কমে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তাহের। তিনি বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে সরকারি দল কিছুটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ইচ্ছাই যদি সংসদের সিদ্ধান্তে পরিণত হয়, তাহলে সেটি স্বৈরাচারী আচরণের শামিল। তাহের বলেন, ‘আমরা এই সংসদকে এভাবে দেখতে চাই না। দেশের স্বার্থে ও গণতন্ত্রের স্বার্থে সরকারি দল যেন সংসদে এবং সংসদের বাইরে বৈষম্য সৃষ্টি না করে।’
ভবিষ্যতে একই নীতিতে সংসদীয় কমিটি গঠন করা হলে বিরোধী দল সংসদে না থাকার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। সভাপতির পদ না দেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এর পর কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে যদি একই নীতিমালা অনুসরণ করা হয়, তাহলে তখন তাঁদের কথা শোনার জন্য এই সংসদে আমরা নাও থাকতে পারি।’
তাহেরের বক্তব্যের পর বিরোধী দলের অধিকাংশ সদস্য অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন। তবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) হাসনাত আবদুল্লাহ এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাইয়েদ উদ্দিন আহমেদ হানজালা অধিবেশন কক্ষে ছিলেন।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলের সদস্যসংখ্যার অনুপাতে দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অতীতেও এমন কোনো রীতি ছিল না। বিরোধী দলকে ১০টি কমিটির সভাপতির পদ দেওয়ার বিষয়ে সরকারি দলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে সংসদীয় চর্চার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে আসনের অনুপাতে বিরোধী দলের সদস্যদের সভাপতিত্ব দেওয়ার বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংশোধনের পর সংসদীয় কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা হবে। তখন সংসদে আসনের অনুপাতে বিরোধী দল কমিটির সভাপতির পদ পাবে।
তবে সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় বিরোধী দল সহযোগিতা করছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বিরোধী দলের সদস্যদের উদ্দেশে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আপনারা বাইরে রাজনীতি না করে সংসদে আসুন। এখানেই কথা বলি।’ সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় সংসদে অংশ নেওয়ার জন্যও তিনি বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানান।
বুধবার গঠিত ১০টি কমিটির মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিএনপির গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি হয়েছেন শিক্ষক নেতা সেলিম ভূঁইয়া। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে সেলিমা রহমানকে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি হয়েছেন হুইপ রকিবুল ইসলাম। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি কলিম উদ্দিন আহমেদ।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি আমানউল্লাহ আমান, পরিবেশ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি হুইপ জি কে গউছ, ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি নাসের রহমান এবং ধর্ম মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম জামাল।
জাতীয় সংসদে মোট ৫০টি সংসদীয় কমিটি রয়েছে। এর মধ্যে ৩৯টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত এবং ১১টি সংসদ-সম্পর্কিত। বুধবারের ১০টি কমিটিসহ এ পর্যন্ত ২৫টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। সংসদ-সম্পর্কিত একটি কমিটির সভাপতির দায়িত্ব ইতিমধ্যে বিরোধী দলীয় উপনেতাকে দেওয়া হয়েছে।