তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধনবিষয়ক সংসদীয় বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের কোনো বিকল্প নেই। তবে এ সরকার কী প্রক্রিয়ায় গঠিত হবে, কারা দায়িত্ব পালন করবেন এবং কত দিনের মধ্যে গঠন করতে হবে—এসব বিষয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব ও পদ্ধতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
জাতীয় সংসদের কেবিনেট কক্ষে বুধবার সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আমাদের প্রবর্তন করতে হবেই। এর কোনো বিকল্প নেই।” তিনি বলেন, সরকার গঠনের প্রক্রিয়া, কর্মপরিধি, সময়সীমা এবং সার্চ বডি বা সিলেকশন কমিটির মাধ্যমে সদস্য বাছাইয়ের পদ্ধতি এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে তা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ কম থাকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংশোধনের বিল উত্থাপনের পর সংসদে বিতর্কের সময়ও বিভিন্ন পরামর্শ ও প্রস্তাব আসতে পারে। কমিটির প্রতিবেদন তৈরি হলে তা পর্যালোচনার সুযোগ থাকবে। এখনই কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করা হয়। সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গঠিত বিশেষ কমিটি রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী, জুলাই আন্দোলনের অংশীজন, বিশিষ্ট নাগরিক, আইন বিশেষজ্ঞ, গণমাধ্যমের সম্পাদক ও শিক্ষকদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছে।
কমিটির দশম বৈঠকে এবার জুলাই শহীদদের পরিবারের সদস্য এবং বিগত ১৭ বছরে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য ও প্রত্যাশা শোনা হয়। বৈঠকে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং পুলিশ ও কারা হেফাজতে মৃত্যুর মতো ঘটনা স্থায়ীভাবে বন্ধে সাংবিধানিক ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রস্তাব আসে। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গুমের অপসংস্কৃতি ও অপরাজনীতি চিরতরে বন্ধ করতে চায় সরকার। দেশে যেন আর কখনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড না ঘটে, কেউ গুমের শিকার না হন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার না হন এবং পুলিশ বা কারা হেফাজতে কারও মৃত্যু না হয়—এমন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা রয়েছে। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তরুণেরা রক্ত দিয়েছেন, জনগণ ত্যাগ স্বীকার করেছে। তাঁদের প্রত্যাশা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। যেসব বিষয় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, সেগুলো সংবিধানে এবং যেসব বিষয় আইন বা বিধিবিধানের মাধ্যমে কার্যকর করা সম্ভব, সেগুলো সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামোর মাধ্যমে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ক্রসফায়ার নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা
ক্রসফায়ার বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) মন্তব্য এবং সরকারের অবস্থান নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে তিনি আগের দিন নিজের বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর দাবি, বর্তমান সরকারের আট মাসে কোনো ক্রসফায়ার, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে মৃত্যু বা গুমের ঘটনা ঘটেনি।
গুমের একটি অভিযোগের বিষয়ে সরকার তদন্ত করেছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোকেও স্বাধীনভাবে তদন্ত করে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের আহ্বান জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, অভিযোগটির বিষয়ে সরকার উন্মুক্ত তদন্তের কথা বলেছে এবং কোনো সরকারি সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার সুযোগ রাখতে চেয়েছে।
আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের প্রসঙ্গে বক্তব্য দিতে গিয়ে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহারে অসতর্কতা হয়ে থাকতে পারে বলে ব্যাখ্যা দেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ক্রসফায়ার করার কোনো নির্দেশনা পাওয়ার কথা তিনি বলেননি, কিংবা নিজে এমন কিছু করতে চান—এ কথাও বলেননি।
পরবর্তী বৈঠকে প্রস্তাব পর্যালোচনা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বিভিন্ন সংবাদপত্রের সম্পাদকদের কাছ থেকে পাওয়া প্রস্তাবগুলো একত্র করা হচ্ছে। কমিটির পরবর্তী বৈঠকগুলোতে ধারাবাহিকভাবে এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হবে। সব প্রস্তাব এখনো বিবেচনাধীন থাকায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি বলেও জানান তিনি।
বৈঠকে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি, হুমাম কাদের চৌধুরী, আনিছুর রহমান ও তাহসিনা রুশদীর লুনা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের বক্তব্যে গুমের পুনরাবৃত্তি রোধ, রাষ্ট্রীয় হেফাজতে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের প্রক্রিয়া নির্ধারণের পাশাপাশি গুম ও হেফাজতে মৃত্যুর মতো ঘটনার বিরুদ্ধে সাংবিধানিক সুরক্ষা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, এখন বিশেষ কমিটির আলোচনায় সেই প্রশ্নগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব প্রস্তাবের চূড়ান্ত রূপ নির্ভর করবে কমিটির পর্যালোচনা, সংবিধান সংশোধনের বিল এবং সংসদীয় বিতর্কের ওপর।