কক্সবাজারের উখিয়ার পর্যটন এলাকা ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভ থেকে বেরিয়ে আসা গ্যাসে লাগা আগুন দুই দিন পেরিয়েও নেভেনি। গ্যাসের নির্গমন অব্যাহত থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার সময়সীমা নিশ্চিত করতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বাপেক্সের বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, গ্যাসের প্রবাহ জোর করে বন্ধ করতে গেলে ভূগর্ভের অন্য কোনো দুর্বল স্থান দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। তাঁদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আগুন আরও কয়েক দিন জ্বলতে পারে।
এদিকে আগুনের শিখা বৈদ্যুতিক তারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় উখিয়ার মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। ঘটনাস্থলের চারপাশে অন্তত ২০০ মিটার নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত করেছে প্রশাসন। আগুন দেখতে উৎসুক মানুষের ভিড় এবং আশপাশের বসতি ও পর্যটন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রধান চ্যালেঞ্জ।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানী ছোটখাল সেতুসংলগ্ন এলাকায় মোহাম্মদ আবদুল্লাহর বসতভিটায় গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য খননকাজ চলছিল। এ সময় মাটির নিচ থেকে দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস বের হতে শুরু করে। পরে সেখানে আগুন জ্বলে ওঠে। এরপর থেকে গ্যাসের নির্গমন ও আগুন অব্যাহত রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়নি।
**গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানে বাপেক্স**
গ্যাসের উৎস, প্রকৃতি ও নির্গমনের কারণ অনুসন্ধানে বুধবার সকালে ঘটনাস্থলে কাজ শুরু করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) বিশেষজ্ঞ দল। এর আগে মঙ্গলবার রাতে দলটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ চালায়।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুন আরহামের প্রাথমিক ধারণা, নলকূপ খননের সময় প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে ভূগর্ভের গ্যাসস্তরের কাছাকাছি পৌঁছানো হয়েছিল। সেখান থেকে ভূগর্ভের ফাটল বা ভূতাত্ত্বিক চ্যুতির মধ্য দিয়ে গ্যাস ওপরে উঠে নলকূপের গর্ত দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে।
এই কর্মকর্তা জানান, গ্যাসের স্তরের ওপরের অংশ উন্মুক্ত হয়ে গেলে উচ্চচাপের গ্যাস ভূগর্ভের বিভিন্ন ফাটল দিয়ে পথ তৈরি করে কয়েক দিন পরও ভূপৃষ্ঠে উঠে আসতে পারে। গ্যাসের সংস্পর্শে কোনো উৎস থেকে স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়ে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। মানুষের কর্মকাণ্ড কিংবা বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গও সম্ভাব্য কারণ হতে পারে।
আগুনের শিখার রং ও ধোঁয়ার ধরন দেখে গ্যাসে তুলনামূলক ভারী হাইড্রোকার্বন থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বাপেক্সের এই কর্মকর্তা। তবে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ না করা পর্যন্ত গ্যাসের প্রকৃতি ও উপাদান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে না। একইভাবে সেখানে গ্যাসের মজুত রয়েছে কি না, থাকলে তার পরিমাণ কত—এখনই সে বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
নাফিফুন আরহাম সতর্ক করে বলেন, গ্যাসের নির্গমন বন্ধ করতে বা এর চাপ আটকে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে ভূগর্ভের অন্য কোনো দুর্বল স্থান দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে আসতে পারে। এতে ঝুঁকি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে আপাতত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে রাখাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
**বিদ্যুৎ বন্ধ, দুর্ভোগে বাসিন্দারা**
আগুনের শিখা বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইনে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, আগুন বৈদ্যুতিক তারের সংস্পর্শে এলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। ঝুঁকি নিরূপণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা এবং আগুনের স্থায়িত্ব স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আবাসিক এলাকা, হোটেল ও পর্যটন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি এ ঘটনা ঘটায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নিরাপত্তার কারণে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি যাতায়াত সীমিত থাকায় আগুন দেখতে আসা লোকজনকেও দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম জানান, ভূগর্ভ থেকে অবিরাম গ্যাস বের হতে থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। জনবল ও কারিগরি সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পরে বাপেক্স, পেট্রোবাংলাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে বিষয়টি অবহিত করা হয়।
**২০০ মিটার এলাকায় নিরাপত্তাবলয়**
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার জানান, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্বে থাকার জন্য প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দলের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঝুঁকি এড়াতে ঘটনাস্থলের আশপাশের ২০০ মিটার এলাকা বিচ্ছিন্ন রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজন হলে সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতা নেওয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে ইউএনও বলেন, ব্রিটিশ আমলে এ এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান করা হয়েছিল বলে তিনি শুনেছেন। তবে বর্তমান ঘটনায় গ্যাসের উৎস ও ভূগর্ভে এর সম্ভাব্য মজুত সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম ও আবু সৈয়দ বলেন, মাত্র ১০ দিন আগে ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১১ জন পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনার পর নতুন করে গ্যাসের আগুন ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। দূর থেকেও আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছে বলে তাঁরা জানান।
ঘটনাস্থলের পাশের একটি পাঁচ তারকা হোটেলের কর্মী জহিরুল ইসলাম বলেন, “যেখানে আগুনের সৃষ্টি হয়েছে, তার পাশের ঘরেই আমরা কয়েকজন হোটেলকর্মী থাকি। এভাবে আগুন জ্বলতে থাকায় খুব ভয়ের মধ্যে আছি।”
এখন গ্যাসের প্রকৃতি ও উৎস শনাক্ত করতে নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ এবং কারিগরি পর্যবেক্ষণের ফলাফলের অপেক্ষা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। আগুন কত দিন জ্বলবে, ভূগর্ভে গ্যাসের মজুত আছে কি না এবং কীভাবে নিরাপদে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যাবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। এর মধ্যে আগুনের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে দূরে রাখা এবং নিরাপদে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় চালুর পথ খুঁজে বের করাই কর্তৃপক্ষের সামনে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ।