আগের দুই মৌসুমের লোকসান কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশায় রংপুর অঞ্চলে আগাম আলু চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন কৃষকেরা। কোথাও জমি তৈরি, কোথাও বীজ সংগ্রহ, আবার কোথাও শুরু হয়েছে আলু রোপণ। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও বাজারদরের অনিশ্চয়তা থাকলেও মৌসুমের শুরুতে নতুন আলু বাজারে তুলতে পারলে ভালো দাম পাওয়ার আশায় মাঠে নেমেছেন তাঁরা। এদিকে বীজ আলুর বিক্রি বাড়াতে ডিলারদের জন্য প্রতি কেজিতে এক টাকা ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)।
বিএডিসির রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলায় সংস্থাটির অনুমোদিত ডিলার রয়েছেন ৮১৩ জন। চলতি মৌসুমে এসব জেলায় ৪ হাজার ৪৯৩ মেট্রিক টন বীজ আলু বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে বীজ বিক্রি শুরু হয়েছে। ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত ১৭৯ জন ডিলার প্রায় ৯৬০ মেট্রিক টন বীজ আলু সংগ্রহ করেছেন। বিক্রি বাড়াতে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ডিলারদের প্রতি কেজি বীজ আলুতে এক টাকা ছাড় ঘোষণা করেছে বিএডিসি।
বিএডিসি রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক মাসুদ সুলতান বলেন, কৃষকদের চাহিদার ভিত্তিতে আগাম বুকিং দিয়ে ডিলাররা বীজ আলু সংগ্রহ করেন। বীজ বিক্রি বাড়াতে ডিলারদের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে।
আগাম আলু চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন রংপুর সদর উপজেলার কৃষক আমজাদ হোসেন। তিনি বলেন, স্বল্পমেয়াদি আগাম আমন ধান কাটার পর একই জমিতে আলু রোপণ করবেন। এ জন্য জমি পরিচর্যা, সার প্রয়োগ ও বীজ সংগ্রহের প্রস্তুতি চলছে। আগের মৌসুমের লোকসান পুষিয়ে নিতে এবার আগাম আলু চাষের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
আমজাদ হোসেনের ভাষ্য, গতবারের তুলনায় বীজের দাম কিছুটা কমলেও সার, কীটনাশক, পরিবহন ও শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। ভালো ফলন পাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম পাওয়া তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আগাম আলু বাজারে তুলতে পারলে ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছেন তিনি।
কৃষক আব্দুল মতিনও উৎপাদন খরচ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি সানশাইন ও বারি-৭ জাতের আলু চাষ করছেন। আব্দুল মতিন বলেন, গত বছরের তুলনায় বীজের দাম কমলেও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। গত বছর এক ট্রলি গোবর সার কিনেছেন এক হাজার টাকায়, এবার তা কিনতে হচ্ছে এক হাজার ২৫০ টাকায়। এর সঙ্গে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি ও সার সংগ্রহের ভোগান্তিও রয়েছে।
নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলায়ও বেড়েছে আলু চাষের প্রস্তুতি। উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর চাষ হয়েছিল ৪ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ এবার ৪০০ হেক্টর বেশি জমিতে আলু চাষের পরিকল্পনা রয়েছে। ধান কাটার পর উঁচু ও বালুমিশ্রিত জমিতে আগাম আলু রোপণ করছেন কৃষকেরা। তাঁদের আশা, মৌসুমের শুরুতে নতুন আলু বাজারে তুলতে পারলে ভালো দাম পাওয়া যাবে।
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার বাহাগিলি ইউনিয়নের নয়নসুখ গ্রামের নারী কৃষক ফরিদা বেগম ১০ বিঘা জমিতে অ্যাস্টেরিক জাতের আলু রোপণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, জমিতে আগাম আলু রোপণের কাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। গত বছর এক বিঘা জমিতে আলুর বীজ রোপণের মজুরি ছিল এক হাজার ৭০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা। এবার তা বেড়ে দুই হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি আয় করেও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
দিনাজপুরের হাকিমপুরেও আগাম জাতের আলু রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। আলু চাষের উপযোগী আবহাওয়া থাকায় ভালো ফলনের পাশাপাশি বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়ার আশা করছেন তাঁরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রংপুর জেলায় ৫৩ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জমি থেকে ১৫ লাখ ৯১ হাজার ৫২৫ মেট্রিক টন আলু উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। ইতিমধ্যে ১ হাজার ৭০ হেক্টর জমিতে আগাম আলু চাষ করা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) কৃষিবিদ মো. সাইফুল আলম বলেন, চলতি মৌসুমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আলু উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। আগাম আলু চাষের মাধ্যমে কৃষকেরা জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
রংপুর অঞ্চলের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে আলু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকের খরচ কমানো, কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়ার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। আগাম আলুর ভালো ফলন ও উপযুক্ত বাজারদর পাওয়া গেলে কৃষকেরা আগের লোকসান কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। অন্যথায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভালো ফলন সত্ত্বেও তাঁদের প্রত্যাশিত লাভ অনিশ্চিত থেকে যেতে পারে।