বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমার সমাপনী দিনে কক্সবাজারের রামুতে বাঁকখালী নদীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী কল্পজাহাজ ভাসা উৎসব। সাতটি সুসজ্জিত কল্পজাহাজ, ধর্মীয় সংগীত, নাচ-গান ও ফানুস উত্তোলনের মধ্য দিয়ে উৎসবটি পরিণত হয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের মিলনমেলায়। বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে ফুটে ওঠে রামুর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য। একই সঙ্গে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বৌদ্ধমন্দির ও বৌদ্ধপল্লীতে হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের দাবিও উঠে আসে অনুষ্ঠানে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে ‘২৯ সেপ্টেম্বর সেই কালো রাত, বিচারহীনতার ১৪ বছর—সম্প্রীতির জাহাজে, ফানুসের আলোয় দূর হোক অন্ধকার’ স্লোগানে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া উৎসবের উদ্বোধন করেন। প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।
কেন্দ্রীয় প্রবারণা পূর্ণিমা ও কল্পজাহাজ ভাসা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি বিপ্লব বড়ুয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, রামুর কল্পজাহাজ ভাসা উৎসব প্রথমবার দেখে তিনি অভিভূত হয়েছেন। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও পারস্পরিক সম্প্রীতির পরিচয় বহন করে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করছে। পাহাড় ও সমতল কিংবা ধর্ম ও বর্ণের ভিত্তিতে বিভাজন না করে সবাইকে মিলেমিশে বসবাস করতে হবে। ধর্ম, রাজনীতি ও সংস্কৃতির নামে যারা বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়, তাদের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বৌদ্ধপল্লীতে হামলার বিচার দাবি
উৎসবের উদ্বোধক অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া বলেন, অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রধান উৎসবগুলোতে সরকারি ছুটি রয়েছে। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষেও সরকারি ছুটি ও বরাদ্দের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানানো হবে।
প্রধান আলোচক কক্সবাজার-৩ (সদর–রামু–ঈদগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, ২০১২ সালে রামুর বৌদ্ধমন্দির ও বৌদ্ধপল্লীতে হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। অনেক আসামি ও জড়িত ব্যক্তির বিচার এখনো হয়নি। মামলাগুলোর পুনঃতদন্তের বিষয়ে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
উৎসবের প্রধান সমন্বয়ক অর্পণ বড়ুয়া বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে অংশ নিয়েছিলেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সেই ঐতিহ্যে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর আঘাত হানে দুর্বৃত্তরা। ওই হামলায় বৌদ্ধপল্লীর বহু ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সময়ের সঙ্গে মানুষ ঘুরে দাঁড়ালেও ঘটনার ১৪ বছর পর বিচার না হওয়ায় বৌদ্ধ সম্প্রদায়সহ শান্তিপ্রিয় মানুষের মধ্যে হতাশা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, হামলার উসকানিদাতা ও ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা জরুরি। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে কল্পজাহাজ ভাসা উৎসব প্রমাণ করে, রামুর সম্প্রীতির ঐতিহ্য এখনো অটুট রয়েছে।
রামুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিল্লুর রহমান বলেন, কল্পজাহাজ ভাসা উৎসব বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী আয়োজন হলেও সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে এটি সর্বজনীন মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বাঁকখালী নদীতে সাতটি কল্পজাহাজ ভাসানো। রাজারকুল, হাজারীকুল, হাইটুপী রাখাইনপাড়া, হাইটুপী বড়ুয়াপাড়া, দ্বীপ-শ্রীকুল, জাদিপাড়া ও মেরংলোয়া গ্রাম থেকে এসব কল্পজাহাজ নিয়ে আসা হয়।
বাঁশ, বেত, কাঠ ও রঙিন কাগজ দিয়ে নান্দনিক কারুকাজে তৈরি জাহাজগুলো দেখতে নদীর দুই তীরে জড়ো হন বিপুলসংখ্যক মানুষ। একাধিক নৌকার ওপর নির্মিত এসব জাহাজে ছিল মাইক ও নানা বাদ্যযন্ত্র। ঢোল, কাঁসর ও মন্দিরার তালে শিশু-কিশোর ও তরুণেরা নেচে-গেয়ে উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তোলেন। জাহাজগুলো নদীর এক তীর থেকে অন্য তীরে ভেসে যাওয়ার সময় মাইকে পরিবেশিত হয় বৌদ্ধ কীর্তন ও বিভিন্ন ধর্মীয় সংগীত।
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে কল্পজাহাজ ভাসানোর আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। পরে বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতারা ‘সাধু, সাধু’ ধ্বনির মধ্য দিয়ে ফানুস উত্তোলন করেন। এরপর মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে রামুতে কল্পজাহাজ ভাসা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। তবে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বৌদ্ধপল্লীতে হামলার পর টানা দুই বছর এ আয়োজন বন্ধ ছিল। পরবর্তী সময়ে আবার নিয়মিতভাবে উৎসবটি উদ্যাপিত হয়ে আসছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কক্সবাজার সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহমুদুল হাসান, রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ কে ফজলুল হক, রামু উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোক্তার আহমদ, সদস্যসচিব আবুল বশর বাবু, ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন ও বিএনপি নেতা মাহিন চৌধুরী।
এ সময় রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের অধ্যক্ষ, বিভিন্ন বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, ফায়ার সার্ভিসের কর্মী, সাংবাদিক এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
বাঁকখালী নদীতে সাতটি কল্পজাহাজের বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে রামুর মানুষ আবারও তুলে ধরেছেন তাঁদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির বার্তা। উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি ২০১২ সালের হামলার বিচার দাবি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, সম্প্রীতি দৃঢ় করতে হলে অতীতের সহিংসতার ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি।