স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রচারের ধরন ও পরিধি নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন আচরণবিধিতে প্রকাশ্য মিছিল, পোস্টার, আকাশযান ব্যবহার করে প্রচার এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রচারের বিরুদ্ধেও রাখা হয়েছে শাস্তির বিধান।
শুধু তাই নয়, নির্বাচনী প্রচারে মাইক ব্যবহারের সময় ও শব্দের মাত্রা নির্ধারণ, বিলবোর্ডের সংখ্যা ও আকার সীমিত করা, যানবাহন নিয়ে শোভাযাত্রা বন্ধ এবং ভোটের দিন ভোটার আনা-নেওয়ার জন্য যানবাহন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করার ক্ষমতাও থাকছে নির্বাচন কমিশনের। পাশাপাশি বিধিমালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ছয় মাস কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে আগের দলীয় নির্বাচনের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণবিধি আর কার্যকর রাখা হচ্ছে না। সেই কারণেই নতুন করে বিধিমালা করা হয়েছে।
ইতিমধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আচরণবিধি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনেও একই ধরনের আচরণবিধি প্রণয়নের কাজ চলছে। নতুন বিধিমালার মাধ্যমে ২০১৬ সালের আচরণবিধি বাতিল করা হয়েছে।
মিছিলই করা যাবে না
নতুন বিধিমালার সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হলো প্রকাশ্য মিছিল নিষিদ্ধ করা। তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কোনো প্রার্থী বা তাঁর পক্ষে কেউ প্রকাশ্য মিছিল করতে পারবেন না।
ট্রাক, বাস, মোটরসাইকেল, নৌযান বা ট্রেন ব্যবহার করে মিছিল কিংবা শোভাযাত্রাও নিষিদ্ধ। নির্বাচনী প্রচারে হেলিকপ্টার বা অন্য কোনো আকাশযান ব্যবহার করা যাবে না।
নির্বাচনের দিন ভোটারদের আনা-নেওয়ার জন্য কোনো যানবাহন ভাড়া বা ব্যবহার করাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
পোস্টারেও নিষেধাজ্ঞা
নির্বাচনী এলাকায় পোস্টার ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোনো প্রার্থী কিংবা তাঁর পক্ষে অন্য কেউ পোস্টার লাগাতে পারবেন না।
শুধু পোস্টার নয়, ভবন, দেয়াল, গাছ, বেড়া, বিদ্যুতের খুঁটি, সরকারি ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের স্থাপনা, সেতু, কালভার্ট, মেট্রোরেলের পিলার ও ফ্লাইওভারসহ বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী প্রচারসামগ্রী লাগানোও নিষিদ্ধ।
পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর উপাদান দিয়ে তৈরি প্রচারপত্র, লিফলেট, হ্যান্ডবিল ও ব্যানার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে।
এআই দিয়ে অপপ্রচার ঠেকাতে নতুন বিধান
এবারের আচরণবিধিতে ডিজিটাল প্রচারের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রচারের সুযোগ থাকলেও সেখানে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, অপমানজনক বা বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য প্রচার করা যাবে না।
নির্বাচনী পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে—এমন কনটেন্ট তৈরিতেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রচার করা যাবে না।
জাতি, ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, লিঙ্গ বা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রচারও নিষিদ্ধ।
ডিজিটাল মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচার শুরুর আগে কোন কোন মাধ্যমে প্রচার চালানো হবে, সে তথ্য রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানাতে হবে।
মাইক বাজবে সীমিত সময়ে
নির্বাচনী প্রচারে মাইক বা শব্দবর্ধক যন্ত্র ব্যবহারের সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়েছে। দুপুর ১২টার আগে এবং সূর্যাস্তের পর মাইক ব্যবহার করা যাবে না।
শব্দের মাত্রা সর্বোচ্চ ৬০ ডেসিবেলের মধ্যে রাখতে হবে। একটি ওয়ার্ডে একজন প্রার্থী একটির বেশি মাইক ব্যবহার করতে পারবেন না।
বিলবোর্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সীমা রয়েছে। একটি বিলবোর্ডের সর্বোচ্চ আয়তন হতে পারবে ১৬ ফুট বাই ৮ ফুট। প্রতি ওয়ার্ডে একজন প্রার্থী একটির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন না।
সরকারি গাড়ি-সুবিধা নিয়ে প্রচার নয়
নির্বাচনী প্রচারে সরকারি সুবিধা ব্যবহার বন্ধেও কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। কোনো প্রার্থীর পক্ষে সরকারি যানবাহন, প্রচারযন্ত্র কিংবা অন্য কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করা যাবে না।
অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না।
স্থানীয় সরকার পরিষদের চেয়ারম্যান, মেয়র, প্রশাসক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না।
ধর্ম, পেশিশক্তি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবহার নিষিদ্ধ
নির্বাচনে পেশিশক্তির ব্যবহার, কুৎসা রটানো ও ধর্মের অপব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা রাখা হয়েছে। স্কুল-কলেজ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও নির্বাচনী প্রচার চালানো যাবে না। সভা আয়োজনের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত নিয়ম মানতে হবে। পুলিশের পূর্বানুমতি নিয়ে সভা করতে হবে। ঘরোয়া সভার ক্ষেত্রেও আচরণবিধির বিধান অনুসরণ করতে হবে।
নির্বাচনী ব্যয়সীমা অতিক্রম করলেও শাস্তির বিধান রয়েছে।
প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে কমিশন
নতুন বিধিমালায় নির্বাচন কমিশনের হাতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও রাখা হয়েছে। কোনো রেকর্ড বা লিখিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোনো মেয়র বা কাউন্সিলর প্রার্থী কিংবা তাঁর নির্বাচনী এজেন্ট আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন বা লঙ্ঘনের চেষ্টা করেছেন বলে প্রতীয়মান হলে কমিশন তদন্ত করতে পারবে।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রার্থিতা বাতিলসহ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। বিধিমালার কোনো বিধান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাস কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
কেন এত বিধিনিষেধ
ইসি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হওয়ায় নির্বাচনী প্রচারের ধরন ছিল ভিন্ন। এখন নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা থাকায় নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আচরণবিধি তৈরি করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, আগে দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হতো। সে কারণে আচরণবিধিও এক রকম ছিল। এখন নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন হবে। তাই নতুন করে আচরণবিধি করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সব প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, যাতে ভোটের সময় কোনো অসুবিধা না হয়।
নভেম্বরের শেষার্ধে ভোট শুরু হতে পারে
আগামী নভেম্বরের শেষার্ধ থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করতে চায় নির্বাচন কমিশন। প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। এরপর পর্যায়ক্রমে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও জেলা পরিষদের নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন আচরণবিধি কার্যকর হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রচারে প্রচলিত মিছিল, পোস্টার ও বড় আকারের শোভাযাত্রার বদলে সীমিত পরিসরের সভা এবং নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল প্রচারই প্রার্থীদের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআইনির্ভর বিভ্রান্তিকর প্রচার ঠেকানো কতটা কার্যকরভাবে সম্ভব হবে, সেটিই হবে নতুন বিধিমালার বড় পরীক্ষা।