ঠাকুরগাঁও-১ (সদর, রুহিয়া ও ভুল্লী) আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল ৮টায় শুরু হয়ে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ভোটগ্রহণ শেষ হয়। এখন চলছে ভোট গণনা। দিনভর বড় ধরনের সহিংসতা বা গোলযোগের খবর পাওয়া যায়নি। তবে ভোটকেন্দ্রে লিফলেট বিতরণের অভিযোগে এক জামায়াত নেতাকে জরিমানা এবং তিনজনকে ভুয়া ভোটার সন্দেহে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সকাল থেকে অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকলেও দুপুরের দিকে তা বাড়তে দেখা যায়। ঠাকুরগাঁও সদর, রুহিয়া ও ভুল্লী এলাকার বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল ভিন্ন ভিন্ন। ভোটারদের কেউ কেউ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে পেরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে একটি কেন্দ্রে অসুস্থ ভোটারকে দোতলায় উঠতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।
রহিমনপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তাঁর কেন্দ্রে প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে। ওই কেন্দ্রের ভোটার পাইকপাড়া গ্রামের ফারাজুল ইসলাম ও প্রস্তমপুর গ্রামের ফরহাদ হোসেন বলেন, তাঁরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিয়েছেন। তাঁদের মতে, কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতিও ভালো ছিল।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ৩ নম্বর নির্বাচনি এলাকার ১১২ নম্বর রায়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত প্রায় ৫৫ শতাংশ ভোট পড়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
রায়পুর এলাকার ভোটার প্রমিলা ওরফে ক্ষেতী সরিয়ে স্বামীর সঙ্গে এসে ভোট দিয়েছেন। তিনি বলেন, সকালে তাঁর ছেলে ও পুত্রবধূও ভোট দিয়েছেন। একই এলাকার ভোটার মাধাই চন্দ্র স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ভোট দিতে আসেন।
অন্যদিকে, ঠাকুরগাঁও সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট কেন্দ্রে অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে ভোট দিতে গিয়ে ভোগান্তির কথা জানান গোবিন্দনগর এলাকার ভোটার আব্দুল লতিফ। তিনি বলেন, অসুস্থ স্ত্রী শরিফা বেগমকে নিয়ে দোতলায় উঠতে তাঁর অনেক কষ্ট হয়েছে। অসুস্থ ও চলাচলে সমস্যায় থাকা ভোটারদের জন্য দ্বিতীয় তলায় ভোটকক্ষ রাখা উচিত হয়নি বলে মনে করেন তিনি।
লিফলেট বিতরণে জরিমানা, আটক তিন
ভোটগ্রহণ চলাকালে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জগন্নাথপুর এলাকার জেপি স্কুল কেন্দ্রে লিফলেট বিতরণের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর এক ওয়ার্ড নেতাকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। জরিমানা অনাদায়ে তাঁকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জরিমানাপ্রাপ্ত আব্দুল করিম জগন্নাথপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি।
এ ছাড়া সদর উপজেলার দানারহাট আনছারিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্র থেকে তিনজনকে ভুয়া ভোটার সন্দেহে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারা হলেন ওই মাদ্রাসার আলিম দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হিমেল ও সিয়াম এবং প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মিনহাজ।
নিরাপত্তায় পাঁচ হাজারের বেশি সদস্য
এ উপনির্বাচনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। সদর, রুহিয়া ও ভুল্লী এলাকার ১৮৫টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণের জন্য ৯৮৯টি ভোটকক্ষ প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন পাঁচ প্রার্থী—বিএনপির মির্জা ফয়সল আমীন, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য-সমর্থিত মো. দেলাওয়ার হোসেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাফেজ ডা. মো. খাদেমুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মো. আব্দুল আলিম নিজামী এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক।
নির্বাচন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রায় ৫ হাজার ৩০০ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। সব কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের ব্যবস্থাও করা হয়।
ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ সুপার বেলাল হোসেন বলেন, সকাল ৮টায় ১৮৫টি কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। অনলাইন বডি-ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে কেন্দ্রগুলো পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরাও ছিল। তাঁর দাবি, সব জায়গায় শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ হয়েছে।
কি বললেন প্রার্থীরা
বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন বলেন, ‘নিঃসন্দেহে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট হচ্ছে। আমার কাছে সব ভোটারই আমার ভোটার। এ এলাকার সব ভোটারই শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে আগ্রহী।’ উপনির্বাচন হলেও ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ভোটারদের মতামতই চূড়ান্ত।
অন্যদিকে, ১১-দলীয় ঐক্য-সমর্থিত প্রার্থী মো. দেলাওয়ার হোসেন বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে হওয়ায় এ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে কি না, তা সরকার, প্রশাসন ও নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকার ওপর নির্ভর করছে। তাঁরা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে স্থানীয় নির্বাচনসহ দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর এখন সবার নজর গণনার ফলাফলের দিকে। কেন্দ্রভিত্তিক ভোটের হিসাব একত্র করার পরই জানা যাবে কোন প্রার্থী কত ভোট পেয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত কে নির্বাচিত হয়েছেন।