আরব দলগুলোর ১৯ আসনে সরকার গঠনের সমীকরণ জটিল, ভোট কারচুপির অভিযোগ লিকুদের
ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট গণনা শেষ হলেও সরকার গঠনের লড়াইয়ে এখনো স্পষ্ট সমাধান মেলেনি। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে ৫৩টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোটের সম্ভাব্য আসন ৪৮। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসন কোনো পক্ষই নিশ্চিত করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সম্ভাব্য ১৯ আসন সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভোটের আংশিক ফল প্রকাশের পর থেকেই ইসরায়েলের রাজনীতিতে উত্তেজনা বেড়েছে। নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলেছে। তবে আরব দলগুলো এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তাদের ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণ নেতানিয়াহুর জোটকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া থেকে দূরে রাখতে ভূমিকা রেখেছে।
আল জাজিরা ও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার (২৮ অক্টোবর) স্থানীয় সময় রাত ৯টা পর্যন্ত পাঁচ লাখ নয়, বরং ৫০ লাখের বেশি ভোট গণনা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি। তখন গণনা করা ভোটের ভিত্তিতে নেতানিয়াহুর জোট ৫৩, আইজেনকটের জোট ৪৮ এবং আরব দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হয়। বৃহস্পতিবারও চূড়ান্ত ফলের অপেক্ষা রয়েছে।
এখনো বিশেষ পদ্ধতিতে দেওয়া কিছু ব্যালট গণনা বাকি রয়েছে। এসব ব্যালটের মধ্যে সেনাসদস্য, কূটনীতিক এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্রের বাইরে থেকে ভোট দেওয়া অন্যদের ভোটও রয়েছে। সেগুলোর গণনা শেষে আসনবণ্টনে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, কোনো জোটের এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই।
আরব দলগুলোকে ঘিরে কারচুপির অভিযোগ
নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এক বিবৃতিতে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে। দলটির দাবি, কিছু আরব ভোটকেন্দ্রে ঘুষ, হুমকি, সহিংসতা, জালিয়াতি এবং ভোটারদের সংগঠিত করতে নিষিদ্ধ সফটওয়্যার ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে। এ-সংক্রান্ত অভিযোগ ও প্রমাণ পুলিশ, শিন বেত এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির কাছে পাঠানো হচ্ছে বলেও জানিয়েছে দলটি।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত বা নির্বাচন কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা রয়েছে।
অন্যদিকে প্রধানত আরব জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী জয়েন্ট লিস্ট বলেছে, ভোটারদের অংশগ্রহণ নেতানিয়াহুর জোটকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন থেকে দূরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দলটির ভাষ্য, ভোটাররা উসকানি ও ভয়ভীতির জবাব দিয়েছেন ব্যালটের মাধ্যমে। আরব নাগরিকদের অধিকার, বৈষম্য ও যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধেও তাঁরা অবস্থান জানিয়েছেন।
জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসুফ জাবারিন জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিকল্প সরকার গঠনের উদ্যোগে তাঁদের জোট সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তবে আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন কোনো সরকারে সরাসরি যোগ না দিয়ে বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন তিনি।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়াই সরকার গঠনের চেষ্টা
নির্বাচনের ফল নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং এরপর গাজায় দীর্ঘ যুদ্ধের পর এটিই ইসরায়েলের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচনকে নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব ও তাঁর সরকারের নীতির ওপর জনসমর্থন যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
৭৭ বছর বয়সী নেতানিয়াহুর জোট সবচেয়ে বড় জোট হিসেবে উঠে এলেও ৬১ আসনের লক্ষ্য থেকে আট আসন দূরে রয়েছে। অন্যদিকে আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটও এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। আরব দলগুলোর আসন যোগ করলে নেতানিয়াহুবিরোধী পক্ষের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৬৭ হলেও ওই দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনে সহযোগিতা নিয়ে ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
নির্বাচনের আগে আইজেনকট আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে মিলে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছিলেন। নেতানিয়াহুও আরব দলগুলোর সমর্থনে সরকার গঠনের সম্ভাবনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে সংখ্যার হিসাবে সম্ভাব্য সমর্থন থাকলেও রাজনৈতিক সমঝোতা কঠিন হয়ে উঠেছে।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আইজেনকট বলেন, তাঁর জোট ইসরায়েলে পরিবর্তন আনা এবং একটি ‘জায়নবাদী সংহতির সরকার’ প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালনে মনোযোগ দিচ্ছে। তাঁর মতে, নির্বাচনের ফল নেতানিয়াহু সরকারের প্রতি অনাস্থার প্রতিফলন।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর জোটের সামনে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। তবে আইজেনকটের সঙ্গে সমঝোতা হলে নেতানিয়াহুকে তাঁর বর্তমান জোটের কয়েকটি দলের অবস্থান সামলাতে হতে পারে। এ ধরনের সরকার গঠনের বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেই।
প্রেসিডেন্টের উদ্যোগে শুরু হবে আলোচনা
চূড়ান্ত ফল ঘোষণার পর ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করবেন। কোন নেতা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করতে পারবেন, তা বিবেচনা করে তাঁকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সমঝোতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি চান, সরকার গঠন নিয়ে অচলাবস্থা থেকে নতুন নির্বাচন আয়োজনের পরিস্থিতি তৈরি না হোক।
ইসরায়েলে একক দলের বদলে জোট সরকারের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করাই প্রচলিত ব্যবস্থা। তবে এবার আরব দলগুলোর সম্ভাব্য আসনসংখ্যা এবং তাদের সঙ্গে জোট গঠনের প্রশ্ন সরকার গঠনের আলোচনাকে আরও জটিল করেছে।
ফলে চূড়ান্ত ভোটের হিসাবের পাশাপাশি দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা, আরব দলগুলোর ভূমিকা এবং নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে ইসরায়েলে ক্ষমতার পালাবদল হবে, নাকি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নতুন কোনো সমীকরণে সরকার গঠনের সুযোগ পাবেন।